
শাহরিয়ার কবির: উপমহাদেশের রসায়ন শাস্ত্রের জনক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, দার্শনিক এবং স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কেমিক্যালের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র (পিসি) রায়ের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। রবিবার (২ আগস্ট) মহান এই বিজ্ঞানীর রাড়ুলীর পৈতৃক ভিটায় দিনটি স্মরণে আলোচনা সভা, শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতাপূর্ণ অনুষ্ঠান, বৃক্ষরোপণ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন করা হয়। শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যে মোড়ানো এই আয়োজনে প্রথিতযশা এই মনীষীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর জন্মভিটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে।
বিজ্ঞানী পিসি রায়ের পৈতৃক বসতভিটা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনার জেলা প্রশাসক মিজ হুরে জান্নাত। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন এসএফডিএফ কর্মকর্তা জি. এম. জাকারিয়া ও প্রভাষক লৎফা ইসলাম। এছাড়া বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী, খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কানিজ ফাতিমা লিজা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক মুহিদুল ইসলাম এবং সহকারী পুলিশ সুপার (ডি-সার্কেল) আমির হামজা।
স্থানীয় বিশিষ্টজনদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডা. আবদুল মজিদ, পৌর বিএনপির সভাপতি আসলাম পারভেজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী রুহুল আমিন, ওসি (অপারেশন) জুলফিকার আলী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক দিদারুল আলম, সহকারী অধ্যাপক আবদুল মমিন সানা, কাজী সাজ্জাদ আহমেদ মানিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জয়ন্ত কুমার ঘোষ এবং প্রধান শিক্ষক গৌতম ঘোষ।
আলোচনা সভায় বক্তারা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবনের বহুমুখী প্রতিভার ওপর আলোকপাত করেন। তারা স্মরণ করেন তাঁর যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’-এর কথা, যা বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে তাঁকে এনে দিয়েছিল অনন্য গৌরব। এছাড়া তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’ এবং ১৯০১ সালে সম্পূর্ণ দেশীয় উদ্যোগে ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতবর্ষে শিল্পায়নের যে দূরদর্শী ভিত্তি তিনি স্থাপন করেছিলেন, বক্তারা তার গভীর প্রশংসা করেন। সাধারণ জীবনযাপন ও দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক হিসেবে পিসি রায় আজও তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস বলে উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা এক বাক্যে দাবি জানান যে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ঐতিহাসিক জন্মভিটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিজ্ঞান পর্যটন ও গবেষণা কেন্দ্র’ এবং এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান জাদুঘর স্থাপন করা হোক।
পাশাপাশি, পিসি রায়ের মহীয়সী মাতার নামে প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ‘ভূবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’-কে দ্রুত সরকারিীকরণের জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।
দিবসের কর্মসূচিকে আরও প্রাণবন্ত করতে বিজ্ঞানীর জীবন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।
পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের আদর্শকে স্মরণ করে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষ ও অতিথিদের মাঝে পরিবেশবান্ধব গাছের চারা বিতরণ করা হয়। পরিশেষে, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ বিজ্ঞানীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক জন্মভিটা ও বসতঘর ঘুরে দেখার মাধ্যমে দিনব্যাপী এই আয়োজনের সফল সমাপ্তি ঘটে।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
