Breaking News

কালিগঞ্জে মব সৃষ্টির মাধ্যমে সুমাইয়া হত্যার ঘটনায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে হত্যা মামলা

Spread the love

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা ঃ সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কাজলা –
কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ও
কাশিবাটি গ্রামের এনামুল হকের মেয়ে ফারজানা সুলতানা হত্যার
ঘটনায় সন্ধিগ্ধ সুমাইয়াকে মব সৃষ্টির মাধ্যমে হত্যার ঘটনায় আদালতে
মামলা দায়ের করা হয়েছে| রবিবার নিহতের পিতা মোঃ আব্দুল লতিফ শেখ
বাদি হয়ে আট জনের নাম উল্লেখ করে এ মামলা দায়ের করেন| সাতক্ষীরার
আমলী আদালত-২ এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মেহেদী হাসান এ ঘটনায় কোন
অপমৃত্যু বা হত্যা মামলা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে আদালতকে
অবহিত করার জন্য কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন|
মামলার বাদি তৌফিক শেখ কালিগঞ্জ উপজেলার কাশিবাটি গ্রামের
কলুইমেদে এলাকার ফজর আলী শেখের ছেলে ও একটি ঘেরের পাহারাদার|
মামলার আসামীরা হলেন, কাশিবাটি গ্রামের এন্তোফা মোড়লের ছেলে
হামিদুল মোড়ল, একই গ্রামের আব্দুল গফফার খানের ছেলে হুসাইন
খাঁন, রাজু আহম্মেদ এর ছেলে রাফি ইসলাম, রমজান আলী খাঁনের ছেলে
রেজাউল ইসলাম খান, রফিকুল ইসলাম খাঁনের ছেলে নাজিম খাঁন, ইমান
আলীর ছেলে সাদ্দাম হোসেন, নিহত সুমাইয়ার ভাসুরের ছেলে হাফিজুল
ইসলাম সরদারের ছেলে তৌফিক হোসেন ও নওয়াপাড়া গ্রামের রফিকুল
ইসলামের ছেলে শামীম হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা ১২ জন|

 

অভিযোগ, লতিফ শেখ হত্যাকারিদের নাম উল্লেখ করে রবিবার আদালতে
মামলা করবেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় আসামীদের বাঁচাতে স্থানীয় এক
প্রভাবশালি জনপ্রতিনিধি পুলিশকে ম্যানেজ করে নিহত সুমাইয়ার
মাদকাসক্ত ও জুয়াড়ি জামাতা আমিরুলের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া

প্রকৃত ঘটনা উহ্য রেখে কারো নাম উল্লেখ না করে যেনতেন প্রকারে
শনিবার রাতেই একটি হত্যা মামলা দায়ের করিয়েছেন|
ঘটনার বিবরন ও লতিফ শেখের দায়েরকৃত মামলা থেকে জানা যায়, একই
গ্রামের এনামুল হকের মেয়ে ফারজানা সুলতানা স্থানীয় কাজলা –
কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী|
ফারজানার পরিবারের সাথে তার মেয়ে সুমাইয়ার পরিবারের সুসম্পর্ক
ছিলো| প্রতিদিনের ন্যয় গত ২০ জুলাই সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যায়
ফারজানা| দুপুর একটার পর টিফিনের সময় প্রতিদিনের ন্যয় সে
বাড়িতে না আসায় তার অভিভাবকগণ বিদ্যালয়ে যাইয়া সন্ধান না
পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে অবহিত করে মাইকিং করা
হয়| বিকেল তিনটার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে| এ সময় পুলিশ ও
ফারজানার ¯^জনরা মুঠোফোনে সুমাইয়াকে অবহিত করলে ও তাকে
বাড়ি ফিরতে বলে| দাওয়াত থেকে ভূমিহীন জনপদ চিংড়িখালি
শশুরবাড়িতে অবস্থান করা সুমাইয়া তার শাশুড়ি তৌফিকা ও মা
নাছিমাকে নিয়ে বিকেল ৫টার দিকে বাড়িতে চলে আসে| খবর পেয়ে
বাবা লতিফ শেখকে অবহিত করে তাকে নিয়ে বোনের বাড়িতে আসে
আব্দুল্লাহ আল মামুন| এ সময় পুলিশ ও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে
ফারাজানা সম্পর্কে কোন তথ্য জানেনা মর্মে অবহিত করলে তাকে চড়
থাপ্পড় মারা হয়| পুলিশ তাকে নিজ জিম্মায় নেয়| উক্ত সময় আসামীগণ
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থিত শতশত জনগণকে উত্তেজিত করিয়ে
জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকে উঠানে থাকা ইট নিয়ে সুমাইয়ার
দুইটি বসতঘরে ঢুকে লোহার রড, বাঁশের লাঠি ও ইট দিয়ে লক্ষাধিক
টাকা মূল্যের ঘরে থাকা দুটি খাট, দুটি আলমারি, একটি ফ্রিজ, ঘরের
চাল, দেওয়াল, দরজা ভাংচুর করে পরে পশ্চিম পাশের ঘরের বিছানাপত্রে আগুণ
লাগিয়ে ৩০ হাজার টাকার মালামাল ক্ষতি করে| পরে আগুন নিভিয়ে দেওয়া
হয়| মাগরিবের নামাজের পর আসামীরা বাড়িল বৈদ্যুতিক আলো
নিভিয়ে দিয়ে সুমাইয়ার কাছ থেকে চাবি না নিয়ে পশ্চিম পাশের্^র
ঘরের তালা ভাঙে| ঘরের মধ্যে তখন ফারাজানার সন্ধান মেলেনি| রাত সোয়া
সাতটার দিকে আবারো বাড়ির আলো বন্ধ করে ওই ঘরের আলো নিভিয়ে
আবারো তল্লাশি চালায় আসামীরা| এ সময় কোন প্রকারে কাঠের

জানালার পাল্লা লাগিয়ে রাখা ওই ঘরের দেয়াল আলমারির ড্রয়ারে রাখা হাত-
পা বাঁধা সুমাইয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করে আসামীরা|
এরপর বারান্দায় অবস্থানকারি পুলিশের কাছ থেকে সুমাইয়াকে
আসামীরা ছিনিয়ে নিয়ে চড় ও থাপ্পড় মারতে মারতে উঠানে চিৎ করে
ফেলে দিয়ে ইট ও হাতুড়ি দিয়ে মুখমণ্ডল, মাথা ও গলাসহ বিভিন্নস্থান
থেঁতেলে দেয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে ইন্দ্রনগর মোড়ে যেয়ে
অবস্থান করে| পাশবিক নির্যাতনে সুমাইয়ার কয়েকটি দাঁত ছাড়িয়ে
পড়ে যায়| রাত সাড়ে আটটার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে সুমাইয়ার
লাশ উদ্ধার করে| হত্যাকারিদের মাধ্যমে পুলিশ সুমাইয়ার সুরতহাল
প্রতিবেদন প্রস্তুত করে পরদিন সুমাইয়ার লাশ সদর হাসপাতালের মর্গে
পাঠায়| সুমাইয়ার লাশ এলাকায় দাফন করতে দেওয়া হবে না মর্মে
হত্যাকারিরা হুমকি দেয়| একপর্যায়ে ২২ জুলাই রাত ১১টার দিকে মর্গ
থেকে সুমাইয়ার লাশ নিয়ে রাত সাড়ে ১২টার পর কলুইমেদে খালপারে দাফন
করা হয়| মর্গ থেকে লাশ নেওয়ার সময় মৃত্যসংক্রান্ত কাগজপত্র চাইলে থানা
ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে নিতে হবে বলে তাদেরকে
জানানো হয়| প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য
হামিদ মোড়লসহ কয়েকজনকে সুমাইয়া হত্যার দায় থেকে বাঁচাতে
তাদেরকে ফারজানা হত্যা মামলার সাক্ষী বানিয়ে সুমাইয়ার ভাই আল
মামুনকে আসামী করা হয়| যাতে সুমাইয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে কোন
মামলা না করা হয় সেজন্য লতিফ শেখ, তার ভাই রবিউল শেখকে হুমকি
ধামকি দেওয়া হয়| মামলা করলেও ওই প্রভাবশালি জনপ্রতিনিধির কথার
বাইরে কারো নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করা যাবে না মর্মে জানতে
পেরে আব্দুল লতিফ রবিবার আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নেন| বিষয়টি
বুঝতে পেরে আব্দুল লতিফকে নিজ অফিসে ডেকে জাতীয় পরিচয়পত্র
নিয়ে থানায় গেলে অজ্ঞাতনামা আসামীদের মামলা হয়ে যাবে বলে
জানিয়ে দেন ওই জনপ্রতিনিধি|
মামলায়( সিআর-৬২১/২৬ নং কালিঃ ) আরো উল্লেখ করা হয়,ফারজানার
কথিত মৃত্যু সংক্রান্ত সুমাইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে তাহার কোন প্রকার
সম্পৃক্ততার সত্যতা না পাওয়া ¯^ত্বেও উল্লেখিত আসামীগণ
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিকটিম সুমাইয়ার বসতঘরসহ বসতঘরে রক্ষিত

উল্লেখিত জিনিসনপত্রাদি ভাংচুর করিয়া এবং একপর্যায়ে আগুণ দিয়া
জ্বালাইয়া দেয়| ফারজানার মৃত্যু সংক্রান্ত ঘটনায় সুমাইয়ার সম্পৃক্ততার
সুষ্ঠু বিচারের জন্য আইনে সোপর্দ না করে আসামীরা নিজেদের
হাতে আইন তুলে নিয়ে নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে আইনতঃ
শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে| মেয়ের উপর সহিংসতার বর্ণনা দেওয়ার
একপর্যায়ে সুমাইয়া ও ফারজানা হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অনতিবিল¤ে^
গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে কাঠগড়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন লতিফ শেখ|
অপরদিকে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি জানতে পারেন যে, লতিফ শেখ
আদালতে রবিবারে মামলা করবেন জানতে পেরে ও কালিগঞ্জ থানার পুলিশের
সঙ্গে কথা বলে তড়িঘড়ি করে নিহত সুমাইয়ার মাদকাসক্ত ও জুয়াড়ি
¯^ামী আমিরুল ইসলামকে শনিবার সন্ধ্যায় থানায় পাঠান| লাশ দাফন
নিয়ে বিপাকে পড়া, ঘরপোড়ানা ও খুনের সহিংসতার কথা না লিখে
প্রকৃত ঘটনার তথ্য গোপন করে সাক্ষী ও আসামীর নাম উল্লেখ না করে
রাতেই একটি হত্যা মামলা (জিআর- ১৬৮/২৬ কালিঃ) দায়ের করানো হয়|
মামলায় আমিরুল উল্লেখ করেছে, গত ২৯ জুন থেকে মাদারীপুরে রং
মিস্ত্রীর কাজ করে সে| ২০ জুলাই সকালে স্ত্রী তাকে কিস্তির টাকা
পরিশোধ করার জন্য ফোন করে জানায়| টাকা না দিলে তাকে হেনস্তা করা
হতে পারে| সে এক হাজার টাকা পাঠানোর কথা বলে| একই দিনে
ফেইসবুকের মাধ্যমে স্ত্রীকে হত্যা করার খবর পান| স্ত্রীকে অজ্ঞাতনামা
লোকজন মারপিট করে হত্যা করেছে| ভাংচুর করা হয়েছে চার লাখ টাকার
মালামাল|
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জজ কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোসলেমউদ্দিন
বলেন, ফারজানার হত্যার বিপরীতে সুমাইয়াকে মব সৃষ্টি করে হত্যা ন্যয়
বিচার ও আইনের পরিপন্থি|
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম জানান, মোঃ
আব্দুল লতিফ শেখকে থানায় এসে মামলা করার ব্যাপারে নির্ভয় দেওয়া হয়|
এরপরও এ ধরণের স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডে নিহতের পিতাকে না পেয়ে
নিহতের ¯স্বামী আমিরুল ইসলাম বাদি হয়ে শনিবার থানায় মামলা করেন|
মামলার তদন্তভার উপপরিদর্শক মল্লিক মনিরুজ্জামানের উপর ন্যস্ত করাহয়েছে| দুটি হত্যাকাণ্ডে পুলিশ তদন্ত করছে ফারজানা হত্যা মামলায়
গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহ আল আমিনের রিমাণ্ড শুনানী আগামি
মঙ্গলবার|

About dainiksatkhira24

Check Also

কালিগঞ্জে ঘের ব্যবসায়ি সঞ্জীব সরকার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার-১

Spread the loveরঘুনাথ খাঁ: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ঠেকরা রহিমপুর গ্রামের ঘের মালিক সঞ্জীব সরকার হত্যার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com