
এসএম আশরাফুল ইসলাম: বাংলার মানুষের জীবনযাত্রায় পান-সুপারি কেবল একটি খাবারের পরিপূরক নয়, এটি এক ঐতিহ্যের অংশ। প্রাচীনকাল থেকে আপ্যায়ন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা অতিথি সংবর্ধনায় পান-সুপারি যেন অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তাই সুপারি শুধু একটি ফল নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্গত উপাদান।বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতিতে কৃষি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শিল্পের সঙ্গেও রয়েছে কৃষির নিবিড় সম্পর্ক। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হয়ে থাকে, যার মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলেই রয়েছে ২৫ শতাংশের বেশি।
একসময় গ্রামীণ বাড়ির আঙিনায় কয়েকটি সুপারি গাছ থাকত কেবল পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। সময়ের পালাবদলে সেই সুপারি আজ দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক ফসলে রূপান্তরিত হয়ে। সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, পাটকেলঘাটা, ডুমুরিয়া কিংবা কপোতাক্ষ অববাহিকার বিস্তীর্ণ মাঠে এখন সারি সারি সুপারি গাছ চোখে পড়ে। দেবহাটা ও কালিগঞ্জেও দেখা মেলে উল্লেখযোগ্য চাষাবাদের।
বাজারে এর কদরও কম নয়। সাতক্ষীরার বিভিন্ন হাটে প্রতিশতক সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০, কখনো ৫০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতিটি সুপারি খুচরা বাজারে তিন থেকে পাঁচ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, এ চাষ তাদের জন্য হয়ে উঠছে লাভজনক ও টেকসই। চারার দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে, আর রোপণের চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই আসে ফলন। আরও বড় সুবিধা হলো—একই জমিতে সবজি বা অন্যান্য ফসলও চাষ করা যায় অনায়াসে।
সুপারির কা-ও সমান মূল্যবান। গ্রামীণ জীবনে ঘরের ছাউনি তৈরিতে সুপারি গাছের কা-ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সুপারি শুধু একটি ফল নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে এ গল্পে আছে অন্য একটি দিকও। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত সুপারি সেবন শরীরের জন্য ক্ষতিকর—লিভার, কিডনি, দাঁত ও মাড়ির ক্ষয় এমনকি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। তবু সামাজিক-সাংস্কৃতিক বন্ধনে বাঁধা এই অভ্যাস কমেনি। বিয়ের আসর থেকে গ্রামীণ দাওয়াত—সব জায়গাতেই পান-সুপারি আজও অতিথি আপ্যায়নের প্রতীক।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সুপারি সাতক্ষীরায় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। কৃষকের ঘরে এনেছে বাড়তি আয়, তৈরি করেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। ঐতিহ্য ও অর্থনীতির এই মিলনে সুপারি যেন দাঁড়িয়ে আছে এক অমূল্য গল্প হয়ে-যেখানে রয়েছে মাটির গন্ধ, মানুষের স্বপ্ন আর জীবিকার টানাপোড়েন।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
