Breaking News

জুলাই সনদের খসড়া আজ দলগুলোকে দেবে কমিশন

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বহুল আলোচিত ‘জুলাই চার্টার’ বা ‘জুলাই সনদ’-প্রণয়নের কাজ একদম শেষ পর্যায়ে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দুই দফায় ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে সনদের একটি খসড়া তৈরি করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই খসড়াটি কমিশন আজ সোমবার রাজনৈতিক দলগুলোকে সরবরাহ করবে। এরপর আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে জুলাই সনদে সই করবে দলগুলো। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় দলগুলোর সঙ্গে আবারও সংলাপে বসছে কমিশন। গতকাল রবিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৯তম দিনের আলোচনা শেষে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আজ জাতীয় সনদের খসড়া প্রেরণ করা হবে। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা সমাপ্ত হবে বলেও আশা ব্যক্ত করেন তিনি। উল্লেখ্য, সংস্কার ইস্যুতে ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে ছয় মাসের জন্য গঠিত ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’-এর মেয়াদ আগামী ৩১ জুলাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সকালে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার শুরুতে সূচনা বক্তব্যে আলী রীয়াজ বলেন, দলগুলো দ্রুত মতামত দিলে সেটা সনদে সন্নিবেশিত করা হবে। সনদের খসড়া নিয়ে সংলাপে আলোচনা করা হবে না, যদি বড় রকমের মৌলিক আপত্তি ওঠে, তাহলে আলোচনায় আনব, না হলে আনব না। আপনাদের পক্ষ থেকে মতামত দেওয়া হলে সেটা সন্নিবেশিত করে প্রাথমিক সনদে ভূমিকা-পটভূমি থাকবে এবং কমিটমেন্টের জায়গা থাকবে।

১২ বিষয়ে ঐকমত্য, সাতটিতে অগ্রগতি হলেও নিষ্পত্তি হয়নি, আলী রীয়াজ সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের অব্যাহত আলোচনায় এপর্যন্ত ১২টি বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া সাতটি বিষয়ে আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু নিষ্পত্তি হয়নি।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো ‘ঐকমত্য’ হিসেবেই সনদে উল্লেখ থাকবে। আর যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি, সেক্ষেত্রে কমিশনের প্রস্তাবটি সনদে উল্লেখ থাকবে। যেসব দল বা যারা এতে ভিন্নমত পোষণ করবে তারা সনদে নোট অব ডিসেন্ট দিতে পারবে; সনদে সেই সুযোগ রাখা হচ্ছে।

এক ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয়, আলী রীয়াজ জানান, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো এ সিদ্ধান্তে একমত হয়েছে যে—একজন ব্যক্তি তার সমগ্র জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এ বিষয়ে সংলাপের বিএনপির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বদানকারী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা একবার বলেছি ১০ বছরের বেশি কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন না। আমি বলেছিলাম, সংবিধান ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের কমিটি থাকলে বিষয়টি মানব না। আমরা এ হাউজের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ-সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে যুক্ত করব। এর বাইরের বিষয়ে আলোচনা হলে আমাদের শর্ত বহাল থাকবে। আশা করি, সেটা বিবেচনা করবেন। এখন ১০ বছরের বিষয়ে আপনারা ঘোষণা দিতে পারেন। বরং এটা আমাদের প্রস্তাব।

‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠনে দলগুলো একমত,ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি জানান, শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে পুলিশের আইনানুগভাবে ও প্রভাবমুক্ত হয়ে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন নিশ্চিতকরণ, পুলিশ বাহিনীর যে কোনো সদস্যের উত্থাপিত অভিযোগ এবং নাগরিকদের পক্ষ হতে পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তিকরণের উদ্দেশ্যে একটি ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের ঐকমত্য হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশ কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে তা উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, ৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, যার বয়স ৭৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এবং অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের নিচে এবং ৬২ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা হবেন কমিশনের সদস্যসচিব। এছাড়া, কমিশনের অন্য সদস্যরা হবেন জাতীয় সংসদের সংসদ নেতার প্রতিনিধি, বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিনিধি, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের এক জন করে প্রতিনিধি, সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়, এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা (জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন), জেলা জজ পদমর্যাদার নিচে নয়, এমন একজন বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা অথবা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের তালিকাভুক্ত একজন আইনজীবী যার আইন পেশায় ন্যূনতম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং একজন মানবাধিকার কর্মী যার দেশে-বিদেশে নিবন্ধিত মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থায় ন্যূনতম ১০ বছরের কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে ন্যূনতম দুই জন নারী সদস্য থাকবেন।

রাষ্ট্রের মূলনীতি প্রশ্নে ঐকমত্য হয়নি, মৃদু উত্তেজনা, সংবাদ ব্রিফিংয়ে আলী রীয়াজ জানান, রাষ্ট্রের মূলনীতির বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়নি। মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি যুক্ত করার পক্ষে-বিপক্ষে দলগুলোর মত রয়েছে। এ ব্যাপারে কমিশন পরবর্তী সময় মতামত জানাবে।

জানা গেছে, মূলত বাহাত্তরের সংবিধান থাকা না থাকা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে গতকালের সংলাপে মৃদু উত্তেজনাও দেখা দেয়। তবে বিদ্যমান সংবিধানের মূলনীতিতে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো বিষয়গুলোকে যুক্ত করার বিষয়ে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল একমত।

আর বাহাত্তরের সংবিধান থাকবে কি থাকবে না, সেটি নিয়ে খোলাসা করে কিছু বলেনি কমিশন। সেটি পরবর্তী সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানেই আপত্তি জানায় বাম দলগুলো। তারা এটি এখনই সুরাহা করতে চায়। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ ডানপন্থী দলগুলো পঞ্চম সংশোধনীর ধারাগুলো রাখার পক্ষে। আর বাম দলগুলোর মন্তব্য নতুন ধারাগুলো নিয়ে তাদের আপত্তি না থাকলেও বাহাত্তরের মূলনীতিতে হাত দেওয়া যাবে না।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি সমুন্নত রেখে আমরা নতুন প্রস্তাব যুক্ত করার পক্ষে। কারণ চার মূলনীতি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক। তাই কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেখানে হাত দেওয়া আমরা মেনে নেব না। তিনি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন। এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বলেন, বেশির ভাগ দল বাহাত্তরের সংবিধান বাদ দেওয়ার কথা বলেছে। আমরা পঞ্চম সংবিধানের পক্ষে। যেখানে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের কথা উল্লেখ ছিল। তিনি এ নিয়ে কমিশনের প্রস্তাবের পক্ষে একমত পোষণ করেন। জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন সব ক্ষেত্রেই চার মূলনীতি। সেগুলো সমুন্নত রেখেই নতুন ধারা সংযুক্ত করতে হবে। এটি সংশোধনের বিষয় জাতীয় সংসদের কাছে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানেই সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, যদিও আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সংযোজন চেয়েছিলাম, তারপরও কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে আমরা একমত। গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান বলেন, ’৭২-এর সংবিধান ছিল এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তিনি বাহাত্তরের চার মূলনীতি বাদ দেওয়া ও কমিশন প্রস্তাবিত মূলনীতি প্রতিস্থাপনের পক্ষে মত দেন।

ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে গতকালের আলোচনায়ও বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এবং এবি পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি অংশ নেন। আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে আলোচনায় কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন ও ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা কিছু বলেননি :হামিদুর রহমান আযাদ

ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংলাপ শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা কিছু বলেননি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তার সাম্প্রতিক বৈঠক নির্বাচন নিয়ে নয়। মূলত দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও মাইলস্টোনের দুর্ঘটনা নিয়ে করণীয় নিয়ে এ বৈঠক হয়েছে। তিনটি ধাপের রাজনৈতিক বৈঠকের দুটিতে নির্বাচন নিয়ে কথা হয়নি। শনিবার তৃতীয় বৈঠকে এ নিয়ে বলছেন বলে আমাদের জানা নেই। তবে এ নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে সরকারকে। তিনি জুলাইয়ের মধ্যে জুলাই সনদ দেওয়ার দাবি জানান।

সব দলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নির্বাচনের তারিখ খোলাসা করা যাবে না :আখতার

ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংলাপ শেষে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সব দলের সঙ্গে আলোচনা না করে নির্বাচনের তারিখ সুনির্দিষ্ট বা খোলাসা করা যাবে না। এর আগে জুলাই সনদ ঘোষণা করতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। বাহাত্তরের মূলনীতিগুলো বাদ দিতে হবে।

About dainiksatkhira24

Check Also

মামুনুল-পাটওয়ারীরা আছেন রাজপথে: নাহিদ ইসলাম

Spread the loveডেস্ক রিপোর্ট: দেশে জুলাই সনদ আর গণভোট বাস্তবায়নে প্রয়োজনে সংসদ আর রাজপথ একাকার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com