
রঘুনাথ খাঁ: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কাজলা –
কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ও
কাশিবাটি গ্রামের এনামুল হকের মেয়ে ফারজানা সুলতানা হত্যা
মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহ আল মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য
আদালতে ১০ দিনের রিমাণ্ড আবেদন জানানো হয়েছে| মামলার তদন্তকারি
কর্মকর্তা কালিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম শুক্রবার সংশ্লিষ্ট
আদালতে এ আবেদন জানান|
এদিকে ফারজানার মৃত্যুকে ঘিরে মব সৃষ্টি করে গৃহবধু সুমাইয়া
খাতুনকে পুলিশের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ইট দিয়ে থেঁতলে ও
পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ৬ দিনের কোন মামলা হয়নি| ফলে হত্যার সঙ্গে
জড়িতরা রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে| তবে এ দুটি হত্যার ঘটনার
নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে|
নিহত সুমাইয়া খাতুনের ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চার বছর
আগে কাশিপুর গ্রামের এন্তোফ মোড়লের ছেলে হামিদুলের কথায় তার
বোন সুমাইয়া খাতুনকে একই গ্রামের আমিরুল ইসলামের সাথে
বিয়ে দেয়া হয়| বিয়ের পর তারা জানতে পারেন যে, আমিরুল একজন
নেশাগ্রস্ত ও জুয়াড়ি| এ নিয়ে সুমাইয়া ও আমিরুলের মধ্যে
প্রতিনিয়ত ঝগড়া হতো| সুমাইয়ার উপর চলতো নির্যাতন| এ নিয়ে
শালিসি ˆবঠক হয়েছে কয়েকবার| এক শালিসি ˆবঠকে হামিদুলকে
লাঞ্চিত হতে হয় মামুনের কাছে| পরবর্তীতে মামুনকে মারপিট করে বদলাও
নেন হামিদুল| এরপর থেকে তাদের মধ্যে সম্পর্কেও চরম অবনতি হয়| তবে
নিহত ছাত্রী ফারাজানা সুলতানা ও সুমাইয়া খাতুনের পরিবারের মধ্যে
সুসম্পর্ক বজায় ছিল| একে অপরের বাড়িতে রান্না করা খাবার
বিনিময় করতেন| চলতো অর্থনৈতিক লেনদেনও| হামিদুলের সঙ্গে তার
বোনের সুসম্পর্ক ছিল| ২০ জুলাই সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সে
ভাগ্নি আমেনাকে খাবার কিনে দিয়ে বাড়ি চলে আসে| দুপুর সোয়া
একটার দিকে কয়েকটি মোবাইল থেকে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়
যে, সুমাইয়া ও ফারজানা তাদের বাড়িতে গেছে কি না?
চিংড়িখালি ভূমিহীন জনপদে বসবাসকারি এশার আলী জানান, তার বলা
মতে গত ২০ জুলাই সকালে তার পুত্রবধু সুমাইয়া খাতুন তাদের বাড়িতে
আসেন| দুপুর দেড়টার দিকে ফারজানার চাচীসহ কয়েকজন
মুঠোফোনে জানতে চান যে, ফারজানা তার কাছে আছে কিনা! উত্তর
না বলায়, তাকে বাড়িতে ফিরে আসতে বলা হয়|
কলুরমেদে গ্রামের নাছিমা খাতুন জানান, ফারজানাকে পাওয়া যাচ্ছে
না এমন খবর পেয়ে বিষয়টি সুমাইয়া তাকে অবহিত করে| তিনিও মেয়ে
সুমাইয়ার সাথে তাদের বাড়িতে চলে আসেন| এ সময় হামিদুলসহ
কয়েকজন সুমাইয়ার কাছে ফারজানা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে
কিছু জানে না বলে জানায়| কিছুক্ষণ পর সুমাইয়ার বাবা শেখ আব্দুল
লতিফ চলে আসায় তারা দইুজন কথা বলে বাড়িতে ফিরে অসেন|
নাছিমা খাতুন আরো জানান, ফারজানাকে কোথাও খুঁজে না পাওয়ায়
সুমাইয়ার উপর চাপ বাড়তে থাকে| একপর্যায়ে বিকেল ৫টার দিকে
পুলিশ সুমাইয়ার লাশ নিয়ে গেছে এমন খবর ছড়িয়ে দিনে একটি মহল
উত্তর দিকের ঘরে অগ্নিসংযোগ করে| পরে সুমাইয়ার কাছে চাবি না
চেয়ে তালা ভেঙে ঘরে ঢোকে পুলিশসহ স্থানীয় কয়েকজন| এ সময় লক
বিহিন পিছনের জানালা খুলে পড়ে ছিল| পরবর্তীতে সোয়া ছয়টার
দিকে আবারো ঘরে ঢুকে কয়েকজন ওয়ালসোকেচ থেকে ফারজানার হাত
ও পা বাঁধ লাশ উদ্ধার করে|| সুমাইয়া কিছু জানে না বলার পরও কোন
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে পুলিশের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে
উঠানে ফেলে দিয়ে পুলিশের সামনেই ইট দিয়ে থেঁতলে মৃত ভেবে ফেলে
রাখে হামিদুল মোড়ল. একই গ্রামের মাসুম, হুসাইন খান, পানি
বিক্রেতা তৌফিকসহ কয়েকজন| পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে
সুমাইয়াকে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করে
ইন্দ্রনগর মোড়ে অবস্থান নেয়| রাত প্রায় ৯টার দিকে পুলিশ এসে
ফারজানা ও সুমাইয়ার লাশ নিয়ে চলে যায়| একজোড়া দু&ধসঢ়;ই আনা
সোনার দুল নিতে ফারাজানাকে ঝালমুড়ি খাওয়ানোর কথা বলে বাড়িতে
ডেকে সুমাইয়া হত্যা করেছে মর্মে হত্যাকারিরা প্রচার করে| নিয়ে
নেওয়া হয় সুমাইয়ার ফোন| নতুন করে হামলার ভয়ে ময়না তদন্তের একদিন
পর গভীর রাতে কলুরমেদে গ্রামে সুমাইয়ার লাশ দাফন করা হয়| আবারো
হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কায় তারা হত্যাকারিদের নামে মামলা করতে
পারছেন না| রয়েছে এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির চাপও|
নাছিমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ফারজানার কানের দুল দুটি ও
সুমাইয়ার মোবাইল ফোন কোথায় তা তিনি জানতে চান| পূর্ব
বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধ নিতে ও মামলাটি ভিন্নখাতে
প্রবাহিত করতে ঘটনাস্থলে না থাকায় পরও ফারজানা হত্যা মামলায় তার
ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আসামী করেছে হামিদ মোড়ল| এমনকি
নিজে সুমাইয়া হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে ফারজানা হত্যা মামলার
প্রধান সাক্ষী হয়েছেন| সুমাইয়া হত্যার ব্যাপারে তারা দ্রুত মামলা
করবেন বলে এ প্রতিবেদককে জানান|
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সুমাইয়ার ঘরে আসবাবপত্র দিয়ে ঘর
দুটি সাজানো- গোছানো ছিল| তবে যে ঘর থেকে ফারজানার লাশ
উদ্ধার করা হয়েছে ওই ঘরের পিছনের জানালার পাল্লা মজবুত করে লাগানো
ছিল না| তাছাড়া সুমাইয়ার ভাসুরের ছেলে মোস্তাককে (২৩) ২০ জুলাই
দুপুরের পর থেকে আজো এলাকায় দেখা যায়নি| তাছাড়া ফারজানা
ইউনিফর্ম পরে স্কুলে এলেও লাশ উদ্ধারের সময় তার পরিহিত পাজামা অন্য রং
এর ছিল| ইউনিফর্মের পায়জামা দিয়ে তার পা দুটি বাঁধা ছিল|
আশঙ্কা করা হচ্ছে স্কুল থেকে সুমাইয়ার বাড়িতে আসা ফারজানাকে
ধর্ষণ করে হত্যার পর পিছনের জানালা দিয়ে ঢুকে হাত ও পা বাঁধা
অবস্থায় ওয়ালসোকেচের মধ্যে রাখা হয়েছে| এ ঘটনার সঙ্গে মোস্তাকসহ
কয়েকজন জড়িত থাকতে পারে| কারণ ৯ বছরের একটি মেয়েকে টেনে
নিয়ে একাকি ওয়ালসোকেচের মধ্যে রাখা অসম্ভব প্রায়| আর সুমইয়া
দুলের লোভে ফারজানাকে হাত ও পা বেঁধে হত্যা করে ওয়ালসোকেচের মধ্যে
রাখলে তাকে মোবাইল ফোনে ডাকার পর সে বাড়িতে আসতো? তা
ছাড়া তার কাছে চাবি থাকার পরও তা না নিয়ে তালা ভাঙা হলো কেন?
মোস্তাকের অবস্থান সম্পর্কে পরিবার নিশ্চুপ কেন? গত বৃহষ্পতিবার
জেলা প্রশাসক মিজ কাওছার আজিজ ফারাজানার বাড়িতে গেলে হামিদ
মোড়ল কেন বললেন স্যার, গণপিটুনিতে মারা গেছে সুমাইয়া|
এনিয়ে যেন কাউকে হয়রানি করা না হয়| তারা আরো জানান, স্থানীয়
প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির ইচ্ছার গুরুত্ব না দিয়ে ¯^াধীনভাবে কাজ
করলে পুলিশ দুটি হত্যাকাণ্ডের ক্লু দ্রুত উদ্ধার করতে পারবে| ক্ষতিগ্রস্তরা
পাবে ন্যয় বিচার|
এ ব্যাপারে হামিদুল মোড়লের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তা বন্ধ পাওয়া
যায়|
এদিকে ফারজানাকে ময়নাতদন্তকারি চিকিৎসক সাতক্ষীরা সদর
হাসপাতালের মাহাফুজুর রহমান প্রতিদেবদন দেওয়ার আগে সে ধর্ষিত
হয়েছিল কিনা তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন|
কালিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম জানান, আব্দুল্লাহ আল
মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ১০ দিনের রিমাণ্ড আবেদন
জানানো হয়েছে| জব্দ তালিকায় ফারজানার স্কুল ইউনিফর্মের পাজামা
না অন্য কিছু তা তিনি বলতে পরেননি| জব্দ তালিকা ও সুরতহাল
প্রতিবেদন উপপরিদর্শক সাব্বির হোসেন প্রস্তুত করেছিল বলে জানান
তিনি।
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম জানান,
সুমাইয়া হত্যার ঘটনায় শনিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত থানায় মামলা
হয়নি| তবে শনিবার সন্ধ্যায় মামলা হতে পারে| তবে নিহতের পরিবারের পক্ষ
থেকে মামলা না করা হলে পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করবে| তবে দুটি হত্যার
ব্যাপারে ন্যয়বিচারের স্বার্থে তারা যথাযথ তদন্ত করে যাচ্ছেন |
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
