
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ: ৫ই আগস্ট, ২০২৬। সেই ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও অদম্য গণজাগরণের মুখে পতন ঘটেছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একটি ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের অপশাসন, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাংকিং খাতের অরাজকতা এবং সাধারণ মানুষের বাক্স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র সূচনা। আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধদের ও তাহমিদ ও শহীদ আসিফ মতো শত শত তরুণের তাজা রক্ত আর হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল এই নতুন ভোর।যেভাবে তৈরি হয়েছিল পটভূমিইতিহাসের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুনের শুরুতে কোটা সংস্কারের একটি অরাজনৈতিক দাবি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছিল। তৎকালীন ৫৬% বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার বিপরীতে মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের দাবি ছিল অত্যন্ত যৌথিক। কিন্তু তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার অহংকার ও দম্ভের বশবর্তী হয়ে সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করতে রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ফলশ্রুতিতে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের বুক পেতে বুলেটের সামনে দাঁড়ানোর অবিস্মরণীয় দৃশ্য এবং ঢাকার উত্তরায় মুগ্ধর “পানি লাগবে কারো, পানি?” বলে শহীদ হওয়ার ঘটনা পুরো দেশের বিবেককে নাড়া দেয়। শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য লড়াই মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক আন্দোলনে’। স্বৈরাচারের দম্ভের প্রতীক গণভবনকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’, যা নতুন প্রজন্মের কাছে ফ্যাসিবাদের নির্মমতা ও বিজয়ের এক জীবন্ত দলিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমনে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এর সুফল হিসেবে পূর্ববর্তী বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনগুলোর কঠোরতা কমেছে এবং গণমাধ্যমসহ সাধারণ নাগরিকেরা এখন স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে। জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পর আজ প্রশ্ন জাগে আমরা কি শহীদদের সেই কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রান্তিক পর্যায়ে গড়তে পেরেছি? রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতির সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। তরুণ সমাজ রাষ্ট্র সংস্কারের যে মহাপরিকল্পনা দেখিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন। বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ ও সংকটগণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘ ১৮ মাস রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুদায়িত্ব পালন করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন সরকার গঠিত হয়। তবে দুই বছর পার হলেও রাজপথের সেই মূল আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ সম্পূর্ণ ‘ব্যবস্থার সংস্কার’ এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলো, দেশের রাষ্ট্র কাঠামো বদলে দেওয়ার জন্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু ক্ষমতার মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এই সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়ে এখনো নানা মানসিক ও আদর্শিক টানাপোড়েন চলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আবার বাড়িয়ে তুলছে।আগামীর অঙ্গীকার’৩৬ জুলাই’ বা ৫ই আগস্ট আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে গেছে, তা হলো জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। কোনো স্বৈরাচারই বুলেটের জোরে বা জুলুম করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে না। জুলাই বিপ্লবের এই দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ নিতে হবে, তরুণদের আত্মত্যাগকে কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বদল নয়, বরং কেন্দ্র থেকে শুরু করে ত্রিমূল পর্যন্ত একটি প্রকৃত অর্থেই বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত এবং মানবাধিকার-বান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক এই সময়ের প্রধান জাতীয় লক্ষ্য। শহীদদের রক্ত যেন কোনো অপশক্তির কাছে পরাজিত না হয়।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
