
স্টাফ রিপোর্টার:
শীত মৌসুম এলেই সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে যায় সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের রেণু সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে ওঠে হাজারো মৌমাছি। এই প্রাণচাঞ্চল্যের মধ্যেই চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সরিষা ক্ষেতের আশপাশে বসানো হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মৌ-বক্স। কৃষি বিভাগ আশা করছে, এসব মৌ-বক্স থেকে প্রায় ৭৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদন সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সাতক্ষীরায় সরিষা চাষ হয়েছিল ১৯ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে। পরের বছর অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে আবাদ কমে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৩১ হেক্টরে। তবে চলতি ২০২৫ মৌসুমে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আবারও আবাদ বেড়ে ১৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে পৌঁছেছে। সদর, তালা, কলারোয়া ও দেবহাটা উপজেলায় এবার সরিষা চাষের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি।
তালা উপজেলার কৃষক আব্দুল কাদের জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন। ফলন ভালো হলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, আগের বছর যে সার ১৭ টাকায় কিনেছেন, এবার সেই সার কিনতে হয়েছে প্রায় ৩০ টাকায়। ন্যায্যমূল্য না পেলে লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠানোই কঠিন হবে।
কলারোয়া উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আশ্বিন মাস থেকেই সরিষা চাষের প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ৫ থেকে ৬ মণ সরিষা পাওয়া গেলেও উৎপাদন ব্যয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কৃষি উপকরণের দাম ও সময়মতো সহায়তা না পাওয়ায় অনেক কৃষক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে সরিষা ফুল মৌচাষিদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। সাতক্ষীরা জেলা মৌচাষি ও মধু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, সরিষা ফুলের মধু স্বাদ ও গুণগত মানে উন্নত হয়। এতে কৃষক ও মৌচাষি—উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছেন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পেলে সাতক্ষীরার মধু বিদেশে রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, একটি মৌ-বক্স থেকে মৌসুমে ৫ থেকে ৭ বার মধু সংগ্রহ করা যায়। বর্তমানে প্রতি মণ মধু ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলার ২৮ জন মৌচাষি প্রায় ১০ হাজার মৌ-বক্স পরিচালনা করছেন এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৭৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভেজাল মধু প্রতিরোধে জেলা নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ ল্যাব পরিচালনা করছে। জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা দীপংকর দত্ত জানান, মধুতে ভেজাল প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌ-বক্স স্থাপন করলে পরাগায়ন বৃদ্ধি পায়, ফলে সরিষার ফলন ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। সরিষার পাশাপাশি বরই, লিচু ফুল ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকাতেও মৌ-বক্স বসিয়ে সারা বছর মধু সংগ্রহ করেন ভ্রাম্যমাণ মৌচাষিরা। কৃষি বিভাগের হিসেবে, এই খাতে সাতক্ষীরায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
