
পাইকগাছা প্রতিনিধি: খুলনার উপকূলীয় জনপদ পাইকগাছা উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা কপোতাক্ষ নদের রাক্ষুসী রূপ যেন কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছে না। দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে নদের অববাহিকার ভাঙন, আর তার সাথে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এক-একটি জনপদ। কপোতাক্ষের এই প্রলয়ঙ্করি তোড়ে ইতিমধ্যেই ওলটপালট হয়ে গেছে পাইকগাছার চিরচেনা ভৌগোলিক মানচিত্র। বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি, পৈত্রিক বসতভিটা আর মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে শত শত পরিবার। কপোতাক্ষের এই করাল গ্রাস থামেনি; নদী ভাঙন এখনো ভয়াবহভাবে অব্যাহত থাকায় চরম আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় দিন কাটছে নদীপাড়ের হাজারো বাসিন্দার।
সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক বুকফাটা হাহাকার আর ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য। কপোতাক্ষ নদের তীব্র স্রোত ও জোয়ারের পানির তোড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার দেয়াড়া, রহিমপুর, সলুয়া, হাবিবনগর, রামচন্দ্রনগর ও অত্র অঞ্চলের ঐতিহ্যের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু আগড়ঘাটা বাজার এলাকা। এছাড়াও নদের তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বোয়ালিয়ার মালোপাড়া, হিতামপুর এবং বাঁকা মালোপাড়ার মতো প্রাচীন জেলেপল্লিগুলো এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে। শত শত পরিবার তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি হারিয়ে আজ যাযাবর। ভাঙনের কবলে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হাব ‘আগড়ঘাটা বাজার’-এর একাংশ ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে, যার ফলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
নদী ভাঙনে সব হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস ও আইনি জটিলতার গল্প এখন পাইকগাছার বাতাস ভারী করে তুলেছে। হাবিবনগর গ্রামের ভুক্তভোগী জামাল মোড়ল তাঁর বুকফাটা কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন,”নদী ভাঙনে আমাদের ৭ পুরুষের ভিটেবাড়ি আজ নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে এখন অন্য জায়গায় যাযাবরের মতো পরবাসীর জীবন কাটাচ্ছি। নদী ভাঙনে আমাদের জমি বিলীন হওয়ার পর আমরা তালা উপজেলার শাহাজাদপুর মৌজার জেগে ওঠা চরের জমি সরকারিভাবে বন্দোবস্ত পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মাথা গোঁজার একটা স্থায়ী ঠাঁই হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই জমি নিয়ে প্রতি বছর আমাদের ওপর হামলা ও মামলা হচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের দেওয়া সেই মিথ্যা মামলা লড়তে লড়তে আমার মতো বহুত ভিটেবাড়ি হারা লোক আজ সর্বস্ব হারিয়ে ফকির হয়ে যাচ্ছে।”
অনুরূপ করুণ দশা বোয়ালিয়ার মালোপাড়ার জেলেপল্লিরও। ক্ষোভ আর চোখে এক আকাশ শূন্যতা নিয়ে বোয়ালিয়ার মালোপাড়ার বাসিন্দা সুশান্ত বিশ্বাস জানান,”নদী ভাঙনে বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি হারিয়ে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো উপায় না পেয়ে কপোতাক্ষ নদের চরেই কোনোমতে একটা খুপড়ি ঘর তুলে জান হাতে নিয়ে মাথা গুঁজে পড়ে আছি। কখন জোয়ারের পানিতে এই শেষ আশ্রয়টুকু ভেসে যায়, সেই আতঙ্কে রাতে চোখে ঘুম আসে না।”
কপোতাক্ষের গ্রাস কেবল মানুষের বসতবাড়িতেই আঘাত করেনি, তা কেড়ে নিচ্ছে এলাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকেও। নদী ভাঙনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দরগাহমহল গ্রামের আবদুল মজিদ অত্যন্ত আবেগঘন ও রুদ্ধ কণ্ঠে জানান,”নদীর এই নিষ্ঠুর ভাঙনে আমার বাল্যকালের স্মৃতিবিজড়িত স্কুল ও মাদ্রাসা চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, আমাদের বাপ-দাদাসহ চৌদ্দ পুরুষের কবরস্থানও নদী গ্রাস করে নিয়েছে। এখন পূর্বপুরুষদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় একটু দোয়া করার মতো জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই।”
নিজের চোখের সামনে বাবার কবর কিংবা ছোটবেলার প্রিয় উপাসনালয় নদীতে ধসে যেতে দেখেও স্থানীয়দের কিছুই করার থাকছে না—এই নীরব কান্না এখন উপকূলের ঘরে ঘরে। ইতিমধ্যেই ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা ভাঙনের মুখে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের একাংশ ধসে পড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত পাঠদান, যার ফলে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে কোমলমতি শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। এর পাশাপাশি বহু বছরের পুরোনো মসজিদ ও মন্দিরও রক্ষা পায়নি নদের করাল গ্রাস থেকে।
বাস্তুভিটাহারা পরিবারগুলোর অবস্থা এখন অবর্ণনীয়। সরকারি বা বেসরকারিভাবে স্থায়ী কোনো পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হওয়ায়, ঘরহারা মানুষগুলো এখন কপোতাক্ষের জরাজীর্ণ ওয়াপদা বেড়িবাঁধের ওপর খুপড়ি ঘর তুলে কিংবা অন্যের জমিতে আশ্রিত হয়ে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। তীব্র রোদ-বৃষ্টি, সুপেয় পানির অভাব আর স্যানিটেশনের চরম সংকটে এই অস্থায়ী ডেরাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগবালাই।
স্থানীয় জনগণের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। বাসিন্দাদের স্পষ্ট অভিযোগ, প্রতি বছর ভাঙন শুরু হলে দায়সারাভাবে কিছু বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলা হয়, যা কপোতাক্ষের তীব্র স্রোত ও জোয়ারের চাপের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। এই জোড়াতালির মেরামত উপকূলের মানুষের কোনো কাজে আসছে না।
বিশিষ্টজনদের দাবি পাইকগাছাবাসীকে এই চরম প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এবং উপজেলার মানচিত্র থেকে আরও কোনো গ্রাম চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ মহলের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এফ. এম. এ. রাজ্জাক।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নদী ভাঙনে মানুষের হাত না থাকলেও নদী শাসনে মানুষের হাত রয়েছে। কপোতাক্ষের এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়।”
স্থায়ী টেকসই সমাধান না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পাইকগাছা উপজেলার একটি বড় অংশ কেবলই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে মানচিত্রে তার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
