Breaking News

উপকূলের রাজনীতিতে ধর্ম ও সম্প্রদায় বিভেদ: দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

Spread the love

মোঃ আলফাত হোসেনঃ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উপকূলীয় রাজনীতিতে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিভেদ মূলত সাম্প্রদায়িকতার কারণে ঘটে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা হয়; ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে আলাদা করে দেখা, তাদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করা, এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিভেদ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা হয়, যা প্রায়শই দাঙ্গা ও সামাজিক অস্থিরতার দিকে পরিচালিত করে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি উপজেলা ও খুলনার কয়রা,পাইকগাছা, দাকোপ,বাটিয়াঘাটা উপকূলীয় অঞ্চল—বিশেষ করে শ্যামনগর উপজেলা ও দাকোপ- বটিয়াঘাটা—বাংলাদেশের এক অনন্য জনপদ। এখানে নদী, বন, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আর সংগ্রামী মানুষের জীবন একসঙ্গে মিশে আছে। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধসহ নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগের পর যুগ পাশাপাশি বসবাস করে আসছে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতিতে এই শান্ত সহাবস্থানের ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে ধর্ম ও সম্প্রদায় বিভেদের রাজনীতির কারণে।মৌলবাদ ধর্মকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জীবনচর্চা কাঠামো। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ধর্মের পরিচয়কে ভিত্তি করেই তৈরি হয়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি মানে অন্য সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বিদ্বিষ্ট, আক্রমণমুখী। একজন ধর্মবিশ্বাসী সাম্প্রদায়িক নাও হতে পারেন। আবার একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ধর্মবিশ্বাসী বা চর্চাকারী নাও হতে পারে। অর্থাৎ ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায়কে নিয়ে বিদ্বেষী রাজনীতি এক কথা নয়। অভিজ্ঞতা বলে, সাম্প্রদায়িকতা অনেক সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুর জমিজমা, সম্পদ দখলের আবরণ হিসেবে ব্যবহূত হয়।

রাজনীতির মাঠে বাস্তবতা:

ধর্মবিশ্বাসী মানেই মৌলবাদী নয়। ধর্মবিশ্বাসী মানেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুসারী নয়। খ্রিষ্টান মানে খ্রিষ্টান সুপ্রিমেসিস্ট নয়; ইহুদি মানেই ইহুদিবাদী নয়; হিন্দু মানেই বর্ণবাদী নয়; ইসলামপন্থি রাজনীতি মানেই সন্ত্রাসী নয়। মৌলবাদ প্রাচ্যনির্দিষ্ট বা প্রাচীন মতবাদ যেমন শুধু নয়; বস্তুত এর শুরু পাশ্চাত্যেই এবং এটি বর্তমানে ‘আধুনিক’ ব্যবস্থারই ফলাফল। ইহজাগতিকতা বা সেক্যুলারিজম এবং গণতন্ত্রও পশ্চিম নির্দিষ্ট এবং ‘আধুনিক’কালের বিষয় শুধু নয়। এর বহু ধারা বিভিন্নকালে মুসলিম বিশ্বসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যায়।

শ্যামনগর,আশাশুনি,কয়রা,পাইকগাছা, দাকোপ,বটিয়াঘাটা উপজেলার মতো দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় মানুষের প্রধান চাহিদা হচ্ছে—টেকসই বেড়িবাঁধ, নিরাপদ পানি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু সুরক্ষা। কিন্তু এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক মাঠে অনেক সময় ধর্মীয় পরিচয় ও সাম্প্রদায়িক আবেগকে সামনে আনা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত উন্নয়ন প্রশ্ন চাপা পড়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ছে অপ্রয়োজনীয় পরিচয়ের রাজনীতিতে।

রাজনৈতিক বিভাজন:
নেতারা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করেন, যা সমাজে বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি করে। ধর্মকে রাজনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের একই স্বার্থের গোষ্ঠী হিসেবে দেখানো হয়।

স্থানীয়ভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নির্বাচনী সময় বা রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে ধর্মীয় বক্তব্য, গুজব কিংবা সম্প্রদায়ভিত্তিক সন্দেহ ছড়ানোর চেষ্টা হয়। এতে দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্যামনগরের গ্রামগুলোতে যেখানে একসময় দুর্যোগ মোকাবেলায় সবাই একসঙ্গে দাঁড়াত, সেখানে এখন বিভেদের বীজ বপনের অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ধর্ম বা পরিচয় দেখে কেউ সাহায্য পায় না—পায় মানুষ হিসেবে। বিভক্ত সমাজ দুর্যোগ মোকাবেলায় দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর।

সংস্কারের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ, সংবিধান সংশোধনের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য সময়ের দাবী।

শ্যামনগরসহ সাতক্ষীরা-খুলনার উপকূলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বসবাস করছে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানালে তাদের নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট আরও বাড়বে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ধর্ম দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না—এই সত্য ভুলে গেলে রাষ্ট্রই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব আরও বেশি। ধর্মীয় বিভাজন নয়, বরং উপকূল রক্ষা, জলবায়ু ন্যায্যতা, কর্মসংস্থান ও মানবিক উন্নয়নকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

খুলনা- সাতক্ষীরার উপকূলের ইতিহাস বলে—এই জনপদ বিভাজনের নয়, সহাবস্থানের। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস হতে পারে, কিন্তু রাজনীতির মূলনীতি হওয়া উচিত মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও উন্নয়ন। উপকূলের রাজনীতি যদি ধর্ম ও সম্প্রদায় বিভেদের পথে হাঁটে, তবে তার খেসারত দিতে হবে পুরো সমাজকেই। এখনই সময় এই বিপজ্জনক প্রবণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার।

সমাধানের পথ:

ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা এবং একটি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক সংহতি বৃদ্ধির জন্য কাজ করা এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা।

About dainiksatkhira24

Check Also

শ্যামনগরে কৃষি জমির মাটি কেটে ইট ভাটায় ঘের মালিককে ১ হাজার টাকা জরিমানা

Spread the loveরঘুনাথ খাঁ: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কৃষি জমির মাটি ইট ভাটায় বিক্রির দায়ে এক ঘের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com