Breaking News

মণিরামপুরের মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎতের অভিযোগ

Spread the love
জেমস আব্দুর রহিম রানা :যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা একাধিক গুরুতর অভিযোগ এখন স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইউনুস আলী মোল্লার বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, শিক্ষার্থীদের অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে দাখিল করা হলেও দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি অনিয়মের ধারাবাহিকতা, যা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। যদিও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কিনা—তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো বর্তমানে যাচাইাধীন বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
সংরক্ষিত নথিপত্র ও অভিযোগপত্র বিশ্লেষণে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে গুরুতর অসংগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ বোর্ডের প্রকাশিত নম্বরপত্রে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত প্রার্থী ছিলেন অন্য একজন, অথচ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত হয়েও মোঃ ইউনুস আলী মোল্লাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে মেধাক্রম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্রে কাটাছেঁড়া, নম্বর পরিবর্তনের চিহ্ন, এবং নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণীতে অসামঞ্জস্য থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে, যা প্রমাণিত হলে তা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান গাছ বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টাকার আর্থিক লেনদেন করা হলেও তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব বা অনুমোদিত প্রক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিধিমালার পরিপন্থী।
এছাড়া একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে মাত্র সাত মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাবে উল্লেখযোগ্য অমিলের তথ্য উঠে এসেছে। প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার টাকার আয়ের বিপরীতে প্রায় ৬৯ হাজার টাকার গরমিল পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সভাপতির অনুমোদন ছাড়া ভাউচার তৈরি, ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা থাকা অর্থ জমা না করা এবং ব্যক্তিগত খরচে অর্থ ব্যবহারের মতো অনিয়ম ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও নিরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি গ্রহণ করা হলেও তা সংশ্লিষ্ট বোর্ডে জমা দেওয়া হয়নি। এর ফলে অন্তত আটজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। যদি অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর অবহেলা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নতুন ম্যানেজিং কমিটির কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হস্তান্তরে অনীহা, আর্থিক হিসাব গোপন রাখা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং জবাবদিহিতা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত হাজিরা প্রদান করেন না, মুভমেন্ট রেজিস্টার অনুসরণ করেন না এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা উপেক্ষা করে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। এমনকি সাময়িক বরখাস্ত সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পরও প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্বে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বিভিন্ন পদে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড একটি সুসংগঠিত অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়, যা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব অভিযোগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে লিখিতভাবে দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খুলনা অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক, যশোরের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, মনিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় থানা প্রশাসন। অভিযোগগুলোর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
তবে অভিযোগ দাখিলের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর থেকে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রাথমিক তদন্ত, প্রয়োজন হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয় নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, অভিভাবকদের আস্থা এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত। তাই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই অভিযোগগুলো কি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি পাবে, নাকি দীর্ঘসূত্রতার আড়ালে থেকে যাবে? সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নিরসনই করবে না, বরং সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

About dainiksatkhira24

Check Also

বেনাপোলে হাসপাতালের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধনের পর সড়ক অবরোধ

Spread the loveমো.সাগর হোসেন: যশোরের বেনাপোলে একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com