Breaking News

শিক্ষা কর্মকর্তাকে জিম্মি করে বরখাস্ত করতে বাধ্য করানো হলো দপ্তরী বিকাশকে

Spread the love

রঘুনাথ খাঁ: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বাওচাষ সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম ˆনশপ্রহরী বিকাশ চন্দ্র বাছাড়কে
ছুটির দিনে বহিরাগত এক প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির
অভিযোগে বাড়ি থেকে তুলে এনে আটক রেখে তিন দফায় নির্যাতন
চালানো হয়েছে| লিখিত অভিযোগ ছাড়া ওই ˆনশ প্রহরীর বিরুদ্ধে
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে রাজী না হওয়ায় প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা
সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জিম্মি করে সাময়িক বরখাস্ত
করতে বাধ্য করানো হয়েছে| গত পহেলা ও ২রা জুন এ হামলার ঘটনার পর
বিকাশ সস্ত্রীক আত্মগোপনে রয়েছে| আতঙ্কে রয়েছে তার পরিবার ও
স্বজনরা।

সরেজমিনে বৃহষ্পতিবার আশাশুনি উপজেলার বাঁকড়া গ্রামে যেয়ে
দেখা গেছে, বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম ˆনশ প্রহরী
বিকাশ চন্দ্র বাছাড়ের বাড়িতে তার বাবা সন্তোষ বাছাড়া, মা উর্মিলা
বাছাড় ও ছোট ভাই সুভাষ বাছাড়ের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ|
বিকাশের কথা জানতেই মা উর্মিলা বাছাড় কেঁদে ফেললেন| উপস্থিত
প্রতিবেশিসহ মা ও বাবা পহেলা জুন সোমবার সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে
ডেকে নিয়ে বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলাল
উদ্দিনের বাড়িতে ডেকে নিয়ে বিকাশকে বহিরাগত এক প্রথম শ্রেণীর
ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ মারপিট করার বর্ণনা দেন| পরদিন সকাল
১০টায় ও দুপুর ১২টায় দুই বার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারতে মারতে

ইয়াছিনের দোকানে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতনের কথা তুলে
ধরেন মা উর্মিলা| সাবেক ইউপি সদস্য সাহেব আলীসহ কয়েকজন না
থাকলে বিকাশকে মব সৃষ্টিকারিদের হাতে জীবন দিতে হতো বলে
অভিযোগ করেন তিনি। বাওচাষ গ্রামের এক দিনমুজুরের বাড়িতে গেলে তার ছেলে আব্দুল কাদের
বলেন, তার দুলা ভাই আশাশুনি উপজেলার বলাডাঙা গ্রামের বাসিন্দা| এক
বছর যাবৎ তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করায় বোন ও ভাগ্নি মাঝে
মাঝে তাদের বাড়িতে আসেন| ভাগ্নি রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে| পহেলা জুন তার দুই ভাগ্নি বাওচাষ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দোলনা খেলতে গেলে প্রথম শেণীতে
পড়ুয়া (বলাডাঙা) ওই ভাগ্নির শ্লীলতাহানি করে বিকাশ| বিষয়টি
জানতে পেরে তারা বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলালউদ্দিনকে জানান|
কয়েকজন বিকাশকে মারপিট করেছেন স্বীকার করে কাদের বলেন, তারা
কোথাও কোন লিখিত অভিযোগ করেননি| তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে
সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
আত্মগোপনে থাকা বিকাশ বাছাড় জানান, পহেলা জুন সোমবার
বিদ্যালয় ছুটি থাকলেও প্রতিদিনের ন্যয় তিনি বিকেলে প্রতিষ্ঠানের
গাছ গাছালিতে পানি দিতে যান| এ সময় বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী এক
ব্যক্তির দুই নাতনি(সাত থেকে আট বছর বয়সী) বিদ্যালয়ে বেড়াতে
আসেন| বেড়াতে আসেন বিদ্যালয়ের পাশ^বর্তী আব্দুল কাদেরের ছেলে
মোহিন, তুহিন, আহছানের ছেলে তবিবুর, ইউনুসের ছেলে হানজানা,
মহিদুলের ছেলে শামীম ও ইয়াকুবের ছেলে বাদশাসহ কয়েকজন| সোয়া
ছয়টার দিকে ওই দুই মেয়ে চলে যায়| এরপরপরই মোহিন, তুহিনসহ তাদের
দুই ভাইপোসহ মাঠে উপস্থিত সকলকে নিয়ে তিনিও বিদ্যালয় থেকে চলে
আসেন| সন্ধ্যায় সাতটার দিকে বাওচাষ গ্রামের আব্দুল কাদের বাওচাষ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলাউল তাকে যেতে বলেছে
বলে ডাকতে আসে| তিনি আলাউলের বাড়িতে চলে আসার পর তাকে
কিছুক্ষণ আগে বিদ্যালয়ে বেড়াতে যাওয়া এক শিশুকে শ্লীলতাহানির
অভিযোগ করে গালে থাপ্পড় মারেন ওই মেয়েটির মা| এ সময় জমি দাতা

আলাউল বিষয়টি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা
ইয়াসমিনকে অবহিত করলে তার কাছ থেকে বিদ্যালয়ের চাবি নিয়ে
নিতে বলা হয়| তিনি চাবি দিয়ে বাড়িতে চলে আসেন| রাত ১১টার
দিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিনকে একটি মহল
জোরপূর্বক বিদ্যালয়ে আসতে বাধ্য করেন|
বিকাশ বাছাড় অভিযোগ করে বলেন. ২ জুন মঙ্গলবার সকার ১০টার দিকে
তিনি বাড়িতে অবস্থান করাকালে গতদিনের ভিকটিমের মামা আব্দুল
কাদের, বাওচাষ গ্রামের রহমতের ছেলে হাফিজুল ইসলাম, একই গ্রামের
আব্দুর রব এর ছেলে ঈদুল আযহা’র পরদিন ভারত থেকে পালিয়ে আসা হযরত
আলীসহ কয়েকজন তার ঘরে ঢুকে একমাত্র শিশু সন্তানকে কোল থেকে
মাটিতে আঁছড়ে ফেলে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সামনে মারতে মারতে
বিদ্যালয়ের পাশে নিয়ে যায়| স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় তিনি বাড়ি
ফিরে আসলে কাদের, হাফিজুল ও হযরতসহ বাওচাষ, বাঁকড়া ও হাজিপুর
গ্রামের ৭০ থেকে ৮০ জন তাকে আবারো বাড়ি থেকে মারতে মারতে
ইয়াছিনের দোকানে নিয়ে আটকে রাখে| সেখানে তাকে নির্যাতনের
ফলে ডান কানের শ্রবন শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি| স্থানীয় সাবেক
ইউপি সদস্য সাহেব আলী, ভুট্টো ও প্রতিবেশি হাফেজ সাহেব
প্রতিবাদ করে রুখে দাঁড়িয়ে তাকে মব সৃষ্টিকারিদের হাত থেকে রক্ষা
করে বাড়িতে পৌঁছে দেন| রাতে আবারো তাকে ডেকে নিয়ে শালিস
করা হয়| শালিসে তাকে ওই শিশুর শ্লীলতাহানির বিষয়ে ¯^ীকার করতে চাপ
প্রয়োগ করা হয়| সেখান থেকে বাড়ি ফিরে জীবন বাঁচাতে তিনি
স্ত্রী ও একমাত্র শিশু সন্তানকে নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন| তাকে
পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করার চেষ্টা
করা হচ্ছে মর্মে তিনি অভিযোগ করেন|
সরেজমিনে বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজির হলে সহকারি
শিক্ষক শাহজাহান শামীম, রামপ্রসাদ বাছাড় ও রুবনা ইয়াসমিন
জানান, তাদের বিদ্যালয়ে ২৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে| নয়জনের মধ্যে
প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারি শিক্ষকের পদ শূন্য| একজন
মাতৃত্বকালিন ছুটিতে| ছয়জন শিক্ষক বর্তমানে কর্মরত| ১৯২১ সালে
ওই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়| মনোরম পরিবেশ ও উন্নতমানের পড়াশুনার
জন্য ২০২৪ সালে বিদ্যালয়টি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান
অধিকার করে।

 

দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী বিকাশের বিরুদ্ধে ছুটির দিনে এক বহিরাগত
শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির বিষয়টি সিসি ক্যামরা, সেই সময়ে
উপস্থিত ওই বহিরাগত শিক্ষার্থীর নিজের খালাত বোনসহ স্থানীয়
আটজনের কাছে ঘটনার সত্যতা মেলেনি বলে জানান ওই বিদ্যালয়ের
কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় কয়েকজন| বিষয়টি যেভাবে সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে শুধু তাদের নয়, বিদ্যালয়ের
সুনাম নষ্ট হয়েছে| বিকাশের কারণে বিদ্যালয়ের বাগান পরিচর্যায়
সৌন্দর্য বৃদ্ধি ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন|
জানতে চাইলে বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা
মোহিন ও তুহিন জানান, বিদ্যালয় থেকে বিকাশের সঙ্গে তারা
একসাথে বেরিয়ে যাওয়া ও শ্লীলতাহানি সম্পর্কে ঘটনার কোন
সত্যতা না থাকার বিষয়টি তারা সকলের উপস্থিতিতে উপস্থাপন করেন|
ঘটনা ঠিক নয় বলে জানানোয় ওই ভিকটিমের নিজের খালাত বোন| এরপরও
ওই ভিকটিমের পরিবার কোন লিখিত অভিযোগ না করায় কিভাবে
বিকাশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো তা তাদের বোধগম্য নয়|
বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলাউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে
তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

বিদালয় পরিচালনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উপজেলা সহকারি
প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
দাবিকৃত ঘটনার সময় ওই ভিকটিমের খালাত বোনসহ উপস্থিত আটজন
ঘটনা সঠিক নয় বলে দাবি করেন| সিসি ক্যামেরায় ও ঘটনার সত্যতা
মেলেনি| এরপরও স্থানীয় একটি মহলের আগ্রাসনী মনোভাব তাকে ও
প্রধান শিক্ষককে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে| একপর্যায়ে তারা ভিকটিম
পরিবারের লিখিত অভিযোগ ছাড়াই বিকাশকে সাময়িক বরখাস্ত করেন|
বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে|

তবে আশাশুনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ¯স্বপন কুমার
বর্মণের সঙ্গে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি ফোন ধরেননি।
বাউচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাবিনা
ইয়াসমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন| লিখিত
অভিযোগ, কোন যৌতিক কারণ ও প্রমান ছাড়া বিকাশের বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নিতে না চাইলে তাকে বিভিন্ন ভাবে অপমান অপদস্ত করা হয় বলে
অভিযোগ করেন তিনি|

About dainiksatkhira24

Check Also

যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের আশাশুনিতে শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময়

Spread the loveজি এম মুজিবুর রহমান: যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ফারুকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com