Breaking News

যশোরে আদালতের রায় উপেক্ষা করে জমি দখলের অভিযোগ

Spread the love

জেমস আব্দুর রহিম রানা: যশোরের চাঁনপাড়ার ছোট্ট একটি কৃষিজমি এখন পুরো এলাকায় অশান্তির মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মাঠে কেটে রাখা ধান দিনের পর দিন পড়ে নষ্ট হচ্ছে। জমির প্রকৃত মালিক বলে দাবি করা আজিজ ডিলারের পরিবার আদালত ও প্রশাসনের ওপর আস্থা রেখেও মাঠে যেতে পারছেন না—অন্য পক্ষের হুমকি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অপপ্রচারের কারণে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একটি জমি নিয়ে গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিবেশ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে জমিটির মালিকানা ঘিরে বছরের পর বছর চলা দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অদৃশ্য ইন্ধন এবং সংবাদমাধ্যমকে অপব্যবহারের এক উদ্বেগজনক চিত্র।

জানা যায়, আজিজ ডিলার জীবদ্দশায় সুসম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিবেশী আব্দুল লতিফকে মৌখিকভাবে বগা হিসেবে জমিটি ব্যবহার করতে দেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে জমির আইনগত অধিকার নিজেরাই ধরে রেখেছেন। সরকারি দপ্তর থেকে রেকর্ড সংগ্রহের পর তারা বুঝতে পারেন—লতিফ পরিবার বহু বছর ধরে জমিটি নীরবে নিজেদের দখলে রেখেছে। আইনগত মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার পরই শুরু হয় বিরোধের নতুন অধ্যায়।

পরিবারের অভিযোগ, আব্দুল লতিফের ছেলে রমজান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জমিটি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। স্থানীয় মানুষের একাংশ বলছে, তিনি এলাকার রাজনৈতিক সখ্যতাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদলীয় বা দুর্বল পরিবারের বিরুদ্ধে জমি–সংক্রান্ত বিরোধে প্রভাব খাটাতে অভ্যস্ত ছিলেন। আজিজ ডিলারের পরিবারের দাবি—রমজান ভয়ভীতি প্রদর্শন, অপপ্রচার এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেওয়ার নানা কৌশলে জমিটি নিজের অধীনে রাখতে চাইছেন।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন আদালতের নির্দেশ জারি থাকা অবস্থায় স্থানীয় একটি পত্রিকায় ‘ধান লুট’ শিরোনামে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশিত হয়। যেখানে আজিজ ডিলারের সন্তানদের ‘লুটকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়—সংবাদটি ছিল সম্পূর্ণ একতরফা, কোনো নথিপত্র যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকাশিত। আজিজ ডিলারের পরিবার বলছে, সংবাদটি ছিল আদালতের সিদ্ধান্ত ব্যাহত করার জন্য পরিকল্পিত প্রচারণা, যার উদ্দেশ্য প্রকৃত মালিকদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা।

এদিকে আদালত জমিটি আজিজ ডিলারের পরিবারের দখলে দিতে একাধিক নির্দেশ জারি করেছেন। কোতোয়ালি থানা, ফাঁড়ি পুলিশ ও ইউনিয়ন পরিষদ যৌথভাবে হস্তান্তর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, এ ঘটনায় রাজনৈতিক চাপ এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয় তৎপরতা রয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, “নথি এক কথা বলছে, মাঠে আরেক কথা—এই ব্যবধানটাই পরিস্থিতিকে বারবার উত্তপ্ত করছে।”

এদিকে মাঠে পড়ে থাকা ধান নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে প্রতি দিন। প্রকৃত মালিকরা বলছেন, “আমরা আইন মানি বলেই অপেক্ষা করছি। কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ওপর অন্যায়ের চাপে রায় থাকলেও ফল ভোগ করতে পারছি না।” জমির পাশে মানুষজন দলবেঁধে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ ধানের দিকে হাত বাড়াতে সাহস পায় না—বিরোধের উত্তেজনা যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হওয়ার মতো।

এসবের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা লতিফ পক্ষকে নীরবে সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে মন্তব্য করছেন এবং উসকানিমূলক কথাবার্তার মাধ্যমে পরিবেশকে আরও অস্থির করছেন।

চাঁনপাড়ার এই জমি বিরোধ এখন স্থানীয় মানুষের কাছে শুধু একটি সম্পত্তি–বিবাদ নয়—এটি আইনের শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাবের তীব্রতা, বিচারিক সিদ্ধান্তের মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও গ্রামীণ ক্ষমতার কাঠামোর এক ভয়ঙ্কর মাত্রা। মাঠে পচতে থাকা ধান যেন এই অসহায় বাস্তবতার নীরব প্রতীক—কাগজে যাদের জমি, তারা জমিতে যেতে পারে না; রায় যাদের পক্ষে, তারা রায় ভোগ করতে পারে না।

স্থানীয়দের একমাত্র প্রত্যাশা, যত দ্রুত সম্ভব আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং পক্ষগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি। কারণ চাঁনপাড়ায় আজ যে উত্তেজনা, তা কাল বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে—তার আগেই সমাধান জরুরি।

About dainiksatkhira24

Check Also

বেনাপোলে হাসপাতালের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধনের পর সড়ক অবরোধ

Spread the loveমো.সাগর হোসেন: যশোরের বেনাপোলে একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com