
শাহরিয়ার কবির, পাইকগাছা:
শীতের সকালের কুয়াশার আড়াল ভেদ করে যখন মাঠজুড়ে ফুটে ওঠে সোনালি সরিষার ফুল, তখন সেই নান্দনিক দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে থাকে কৃষকের ঘাম, ধৈর্য আর প্রত্যাশার গল্প। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের মালত গ্রামের কৃষক হারুন অর রশিদের জীবনও তেমনই এক অনুপ্রেরণার গল্প—যেখানে সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতি বদলে দিয়েছে তাঁর ভাগ্য।
মৃত শাহাজুদ্দীন গাজীর ছেলে হারুন অর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে ধান ও মাছ চাষের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধান চাষে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সার ও কীটনাশকের মূল্য ঊর্ধ্বগতি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন। সংসারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিকল্প ফসল চাষের কথা ভাবতে শুরু করেন।
এই ভাবনা থেকেই তিনি স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সরিষা চাষ সম্পর্কে পরামর্শ নেন। উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ, জমির সঠিক প্রস্তুতি ও সময়মতো বপনের মাধ্যমে শুরু করেন নতুন যাত্রা। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জমিতে সবুজ সরিষার গাছ গজিয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় হলুদ ফুলে ভরা বিস্তীর্ণ মাঠে।
হারুন অর রশিদ কপোতাক্ষ নদের তীরে হিতামপুর মৌজার বোয়ালিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় ৭০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে সরিষা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমির জন্য বছরে লিজ দিতে হচ্ছে ১১ হাজার টাকা। এ মৌসুমে তিনি মোট ৫০ কেজি সরিষার বীজ বপন করেন, যার একটি অংশ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই), বিনেরপোতা, সাতক্ষীরা থেকে সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন।
তিনি জানান, সরিষা চাষের বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলন পাওয়া যায়। সেচ ও কীটনাশকের প্রয়োজন কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে। নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ করায় রোগবালাইও কম হয়েছে। মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা যায়, যা দ্রুত লাভের সুযোগ সৃষ্টি করে।
হারুন অর রশিদ বলেন, “আগে মনে হতো কৃষিকাজ মানেই শুধু কষ্ট আর লোকসান। এখন বুঝেছি, পরিকল্পনা আর আধুনিক পদ্ধতি থাকলে কৃষি থেকেই ভালো আয় করা সম্ভব।”
তিনি আরও জানান, ফসল কাটার সময় কিছুটা বাড়তি খরচ হয়। ৭০ বিঘা জমির সরিষা কাটতে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।
তার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে আশপাশের কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই সরিষা চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এবং আগামী মৌসুমে চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
সরিষা কাটার পর একই জমিতে মাছ চাষের পরিকল্পনাও রয়েছে হারুন অর রশিদের। তবে তিনি সরকারি সহায়তা সময়মতো না পাওয়ার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, “সময়মতো সার ও বীজ পেলে আমরা আরও ভালোভাবে এগোতে পারতাম।”
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. একরামুল হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে বৃষ্টির কারণে সরিষা চাষ কিছুটা পিছিয়ে গেলেও হারুন অর রশিদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, “হারুন অর রশিদ বীজ পাচ্ছিলেন না। আমি নিজে বিএআরআই সাতক্ষীরা থেকে বীজ এনে তাকে সরবরাহ করেছি। আমরা বীজ উৎপাদন না করলেও পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, সরিষা চাষের জন্য ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযোগী। অতিরিক্ত তাপমাত্রা হলে ফলনে বিরূপ প্রভাব পড়ে।
কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিতে হারুন অর রশিদের এই সাফল্য প্রমাণ করে—সঠিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও পরিশ্রম থাকলে কৃষিই হতে পারে সোনালি স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
