Breaking News

খোকন দাস হত্যাকাণ্ডে থেমে গেল ২০ বছরের ব্যবসা, আয়ের পথ হারাল পরিবার

Spread the love

নিউজ ডেস্ক:
প্রায় ২০ বছর আগে শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কেউরভাঙা বাজারে একটি ছোট ওষুধের দোকান খুলেছিলেন খোকন চন্দ্র দাস। পরে বাড়তি আয়ের আশায় সেই দোকানের ভেতরেই শুরু করেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা। ওই দোকানের আয়ের ওপর নির্ভর করেই বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলছিল তার সংসার।

কিন্তু খোকন চন্দ্র দাস নিহত হওয়ার পর পরিবারটিতে দোকানটি চালানোর মতো আর কেউ নেই। বন্ধ হয়ে গেছে একমাত্র আয়ের উৎস। একদিকে নিরাপত্তাহীনতা, অন্যদিকে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী সীমা দাস।

খোকন চন্দ্র দাস ডামুড্যা উপজেলার তিলই গ্রামের পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলে। গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডামুড্যার কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে ও শরীরে পেট্রলজাতীয় তরল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সকালে তিনি মারা যান।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কনেশ্বর এলাকার বাবুল খানের ছেলে সোহাগ খান (২৮), সামছুদ্দিন মোল্যার ছেলে রাব্বি মোল্যা (২৪) ও শহীদ সরদারের ছেলে পলাশ সরদার (২৫)–এর বিরুদ্ধে ডামুড্যা থানায় মামলা করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে খোকন দাসের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে মামলাটি করেন। শনিবার গভীর রাতে র‍্যাব কিশোরগঞ্জ থেকে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে।

পরেশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমি বৃদ্ধ মানুষ, একা চলতে পারি না। একমাত্র ছেলে খোকনই ছিল আমার শেষ অবলম্বন। আজ সে নেই। এখন কী নিয়ে বাঁচব? ছেলের বউ আর নাতিদেরই বা কে দেখবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে থাকা অবস্থায় খোকন হত্যাকারীদের চিনে তাদের নাম বলে গেছে। সেই অনুযায়ী মামলা করেছি। কিন্তু তারা আমাদেরই এলাকার লোক। এখন শুনছি সুযোগ পেলেই তারা আবার হামলা করতে পারে। এই আতঙ্ক নিয়েই আমাকে এখন বাঁচতে হচ্ছে।’

পরেশ চন্দ্র দাসের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে খোকনই পরিবারের হাল ধরেছিলেন। তার স্ত্রী চার বছর আগে মারা যান। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। খোকন, তার স্ত্রী সীমা দাস ও তিন সন্তানকে নিয়েই চলছিল বৃদ্ধ পরেশের সংসার।

খোকন দাসের তিন ছেলে—বিশ্বজিৎ দাস (২১), শান্ত দাস (১৬) ও আদর দাস (৪)। বড় ছেলে বিশ্বজিৎ এইচএসসি পাস করার পর গত বছর কাজের সন্ধানে রাশিয়ায় যান। মেজ ছেলে শান্ত স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ছে।

ডামুড্যা–শরীয়তপুর সড়ক থেকে প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে তিলই গ্রামে তাদের বাড়ি, যা স্থানীয়ভাবে ‘তিলই ঠাকুরবাড়ি’ নামে পরিচিত। তুলনামূলক নির্জন ওই এলাকায় প্রতিদিন রাতে দোকানের টাকা নিয়ে একাই বাড়ি ফিরতেন খোকন। এই সুযোগই দুর্বৃত্তরা কাজে লাগিয়েছে বলে জানান স্বজনেরা।

খোকনের আত্মীয় ও প্রতিবেশী নিখিল দাস বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা জানত, সে প্রতিদিন রাতে টাকা নিয়ে এই নির্জন পথ ধরে ফেরে। ভালো মানুষ ছিল, কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল না। হামলা চালিয়ে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এতে পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে তার পরিবার।’

ঘটনার পর আহত খোকনকে হাসপাতালে নিয়ে যান স্ত্রী সীমা দাস। স্বামীর মৃত্যুর পর শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সীমা দাস বলেন, ‘শ্বশুরই মামলার বাদী। এখন সব সময় ভয় নিয়ে থাকতে হচ্ছে। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আবার চাপ আসবে কি না জানি না। সংসার চালানোর একমাত্র জায়গা ছিল এই দোকানটা। সেটাও বন্ধ। বড় ছেলে বিদেশে, সেখানেও আয় করতে পারছে না। জানি না কীভাবে সন্তান আর শ্বশুরকে নিয়ে চলব।’

ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রবিউল হক বলেন, খোকন দাস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। খোকনের পরিবারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দিয়ে মামলার বিচারকাজ শেষ করা হবে।

About dainiksatkhira24

Check Also

সাতক্ষীরায় রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ৯ হাজার কেজি আম উদ্ধার, পরে ধ্বংস

Spread the love  নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে কেমিক্যাল ও কার্বাইড দিয়ে পাকানো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com