Breaking News

সাতক্ষীরা সীমান্তে চোরাচালানের সাম্রাজ্য: বিজিবি-পুলিশের নামে উঠছে চাঁদা,অন্ধকার নামলেই ‘বর্ডারলেস’ বাংলাদেশ!

Spread the love
স্টাফ রিপোর্টার:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোরাচালান সিন্ডিকেট। প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মধ্যেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা ইছামতি নদী ও স্থলপথ ব্যবহার করে প্রতিরাতে দেশে ঢুকছে ভাইরাসযুক্ত নিম্নমানের গলদা চিংড়ির রেনু (পোস্ট লার্ভা বা পিএল), ফেনসিডিলসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। স্থানীয়দের ভাষায়, দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সাতক্ষীরার পুরনো ‘গডফাদার’ চক্র নতুন করে সীমান্তজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলার একাধিক সীমান্ত পয়েন্ট এখন ছোট ছোট ‘চোরাঘাটে’ পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামার পর চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের ভাড়াটে ‘রাখাল’ বা ‘মুটে’ নামে পরিচিত বাহকরা ইছামতি নদী সাঁতরে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থলপথে ভারত থেকে ভাইরাসযুক্ত নিম্নমানের গলদার রেনু, মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য অবৈধ মালামাল দেদারছে নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত থেকে চোরাচালানী পণ্য বাংলাদেশে নেওয়ার বিনিময়ে তারা পেয়ে থাকে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক।
সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র হাসাখালি-কালুতলা ক্যাম্পের সদস্যরা পৃথক অভিযানে আব্দুর রহিম,  হাবিবুল্লাহ সরদার ও মিলন হোসেন নামের তিন বাংলাদেশিকে আটক করেছে। আটককৃত আব্দুর রহিম দেবহাটা উপজেলার নাংলা ঘোনাপাড়া গ্রামের আব্দুল গফফারের ছেলে, হাবিবল্লাহ চরশ্রীপুর গ্রামের আজিবর সরদারের ছেলে এবং মিলন হোসেন পার্শ্ববর্তী টাউনশ্রীপুরের ইমান আলীর ছেলে। ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং গলদা চিংড়ির রেনু ও ফেনসিডিল পাচারের সময় তাদেরকে আটক করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ভারতের হাসনাবাদ থানার ওসি সঞ্জয় কুমার রায়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা ভারতেই কারাভোগ করছেন।
এদিকে, যৌথ অভিযানে গত রোববার সন্ধ্যায় সাতক্ষীরার হাড়দ্দাহ সীমান্ত থেকে ৬৩০ বোতল এবং শুক্রবার রাতে কালীগঞ্জের খানজিয়া সীমান্ত থেকে ১৬৪৯ বোতল ফেনসিডিলসহ কয়েকজন মাদক কারবারিকে আটক করেছে র‌্যাব ও বিজিবি। তাছাড়া শুক্রবার রাতে দেবহাটার নাংলা সীমান্ত থেকে ভারতীয় নিম্নমানের ভাইরাসযুক্ত গলদা রেনুর একটি ছোট চালান আটক করেছে দেবহাটা থানা পুলিশ।  একইদিনে আলীপুর থেকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকার স্বর্ণসহ এক নারীকেও আটক করে বিজিবি। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হলেও সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান যেন কোনোভাবে থামছেই না।
সপ্তাহব্যাপী চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য দেবহাটা সীমান্তে চালানো অনুসন্ধানে একাধিক সূত্র বলছে, সীমান্তের ওপারে ভারতীয় চোরাকারবারি চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সাতক্ষীরার শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেটের গডফাদাররা পুরো চোরাচালান নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে স্থল ও জল সীমান্ত লাগোয়া ৫ উপজেলাকেই চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে গডফাদাররা। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি চোরাচালান সংঘটিত হয় দেবহাটার বিস্তৃর্ণ সীমান্ত দিয়ে। তারপরই কালীগঞ্জ সীমান্ত এবং শ্যামনগরের সুন্দরবনাঞ্চল। বাকিটা সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়ার সীমান্ত দিয়ে।
দেবহাটার ভাঁতশালা, কোমরপুর নিমতলা, শিবনগর রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রের বনাঞ্চল, টাউনশ্রীপুর, চরশ্রীপুর, বসন্তপুর, খানজিয়া, নাংলা-নওয়াপাড়া, কালীগঞ্জের সুইলপুর ও তার আশপাশের এলাকা, শ্যামনগরের কৈখালিসহ সুন্দরবনের কোলঘাঁষা কিছু এলাকা, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাড়দ্দাহ, শাঁখরা, ভোমরা ও তার আশপাশের এলাকা এবং কলারোয়া উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ও কাঁকডাঙাসহ আশপাশের সীমান্ত এলাকা গুলোকেই ছোট ছোট ‘চোরাঘাট’ হিসেবে চোরাচালানের নিরাপদ রুট বানিয়ে ফেলেছেন গডফাদাররা।
রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক অবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে কন্ট্রোলের ক্ষমতার ওপর ভর করে একেক সিন্ডিকেট, এমনকি বর্ডার থেকে শুরু করে প্রশাসন ম্যানেজ- প্রতিটি সেকশন নিয়ন্ত্রণ করেন একেক গডফাদার। এসব সিন্ডিকেটগুলোর নেতৃত্বে থাকা শীর্ষ চোরাকারবারিদের মধ্যে রয়েছেন, সাতক্ষীরার মিলবাজারের জাহাঙ্গীর, মতিনুর, ঝিকরগাছার বাবলা, কালীগঞ্জের কিবরিয়া, পারুলিয়ার রবিউল ইসলাম রবি, নওয়াপাড়ার আদর, মালেক, আজগার, মধু, সুশীলগাতীর মান্নান, শফিকুল হাজি, শ্রীপুরের সাঈদ, মোসলেম, শরিফুল ইসলাম, ভাতশালার হোসেন ও সালাম, কোমরপুরের ইউপি সদস্য আব্দুল আলিম, হাড়দ্দাহ’র আব্দুল্লাহ, আহসান, সাগর, ভোমরার কবির মেম্বার ও গয়েশপুরের আনারুলসহ আরও বেশ কিছু চোরাকারবারি।
সীমান্ত টপকে বাংলাদেশে ঢোকার পর ভাইরাসযুক্ত গলদা রেনু’র চালান প্রাইভেটকারে করে দ্রুত নেওয়া হয় দেবহাটার কুলিয়া ব্রীজের নিচে কথিত রেনু বাজারে। সেখান থেকে তা সাতক্ষীরার প্রায় প্রত্যেকটি মাছের ঘেরসহ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়, যা চাষ করে প্রতিবছর সর্বস্ব খুঁইয়ে পথে বসছেন হাজারো মৎস্য চাষি ও খামারীর পরিবার। অন্যদিকে মাদকের চালান বর্ডার থেকেই চলে যায় চোরাকারবারিদের গোপন ডেরায়, পরে হাতবদল হয়ে পৌঁছায় ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে।
সূত্রের দাবি, সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল সাতক্ষীরার দু’টি বিজিবি ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক, এমনকি খোদ পুলিশ সুপারও। ফলে সীমান্তের বিজিবি ক্যাম্প গুলোর কমান্ডার ও কিছু অসাধু সদস্য, সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশের কিছু অসৎ অফিসার এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করেই চলছে এই রমরমা চোরাচালান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের কয়েকজন জানিয়েছেন, প্রতিটি চালানের বিপরীতে গলদা রেনু ও মাদকের বস্তা গুনে বিজিবি’র নামে বলপ্রতি ২ হাজার টাকা পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পের অসৎ সদস্যদের হাতে। আর কুলিয়ার ওই কথিত রেনু’র বাজারে বসেই দেবহাটা থানা, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এমনকি পুলিশ সুপারের নামে বলপ্রতি ১৮শ’ টাকা হারে আদায় করেন স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। যা রীতিমতো ওপেন-সিক্রেট। তাদের দাবি, চোরাকারবারিদের থেকে আদায়কৃত সেই অবৈধ অর্থ পরে বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায় এবং গলদা রেনু’র বস্তা গুনে টাকার হিসাব রাখতে বর্ডার থেকে শুরু করে কুলিয়ার ওই রেনু’র বাজারে সার্বক্ষণিক অঘোষিত মোতায়েন থাকেন দেবহাটা থানার কথিত সোর্স হবিবর রহমান ওরফে হবি। চালান বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর ভারতীয় চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের পাওনা মেটানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। কুলিয়ার হুন্ডি মামুন এবং সখিপুর রেজিষ্ট্রি অফিস মোড়ের স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি ব্যবসায়ী রুহুল আমিনসহ কয়েকজনের মাধ্যমে প্রতিরাতে চোরাচালানের প্রায় কোটি টাকা অবৈধভাবে পাচার হয় ভারতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসযুক্ত নিম্নমানের গলদা রেণু যেমন সাতক্ষীরার সাদা সোনাখ্যাত চিংড়ি শিল্পের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তেমনি মাদকের বিস্তার সীমান্তবর্তী এলাকার তরুণ ও যুব সমাজকে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার জি.এম সেলিম বলেন, ‘ভারত থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই চোরাই পথে গলদা চিংড়ির রেনু উদ্বেগজনক হারে বাংলাদেশে ঢুকছে। এসব রেনু বিভিন্ন ভাইরাস ও রোগ জীবানুতে আক্রান্ত থাকে। ফলে জেলার অধিকাংশ মৎস্য ঘেরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিবছর ব্যপক হারে রপ্তানীযোগ্য চিংড়ি মারা গিয়ে চাষিরা সর্বস্বান্ত হন। তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরায় বর্তমানে যে পরিমান গলদার রেনু উৎপাদিত হচ্ছে তাতে সহজেই চাহিদা পূরণ সম্ভব। কুলিয়া রেনু’র বাজারে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় দেবহাটা উপজেলা প্রশাসনকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সীমান্তে চোরাচালানের বিষয়ে জানতে চাইলে নীলডুমুর ১৭ বিজিবি ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. শাহরিয়ার রাজীব বলেন, ‘সীমান্তে চোরাচালান ঠেকাতে এরইমধ্যে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত ল্যান্ড টহলের পাশাপাশি স্পিডবোটে ইছামতির জলসীমাতেও টহল জোরদার, র‌্যাব-পুলিশের সাথে যৌথ অভিযান, মহাসড়কে ব্যারিকেড বসিয়ে ব্লক রেইড করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে সীমান্তে ভারতীয় অবৈধ গলদা রেনু ও মাদকের চালান আটক হয়েছে। মাঝে মাঝে চোরাকারবারিরা মুঠোফোনে ভুল তথ্য দিয়েও বিজিবিকে মিসগাইড করে। সড়ক থেকে নদী- সবখানেই বিজিবি’র ওপর নজর রাখতে চোরাকারবারিরা গুপ্তচর নিয়োগ করে। কেউ চা দোকানি, কেউ পথচারি আবার কেউ ডিঙ্গি নৌকায় জেলের ছদ্মবেশে নজর রাখে। তাছাড়া সীমান্তের সড়কগুলোর বেহাল অবস্থা এবং স্ট্রিট লাইট না থাকায় অভিযানে বেগ পেতে হয় বাহিনীর সদস্যদের। চোরাচালানের নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের ধরতে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। একইসাথে অবৈধ লেনদেন কিংবা চোরাচালানের সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান স্বত্ত্বেও কীভাবে রাতের পর রাত এমন সংগঠিত চোরাচালান চলছে, আর কারাই শেল্টার দিচ্ছে এই অদৃশ্য সাম্রাজ্যের নেপথ্যের গডফাদারদের? সাতক্ষীরার সীমান্তজুড়ে এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত।

About dainiksatkhira24

Check Also

তালায় তুবা পাইপ এ্যান্ড ফিটিংস ইন্ডাস্ট্রিজ ‎বেকার সমস্যা সমাধানে অভূতপূর্ব অবদান

Spread the loveফারুক সাগর: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অভূতপূর্ব অবদান রেখে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com