Breaking News

উৎসব বৈসাবিকে ঘিরে আনন্দে ভাসছে পাহাড়

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্ট: ভোরে জলদেবীর উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল ভাসিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের প্রাণের উৎসব বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে।
তুরু রুতু তুরু রু; সুমুর সুপতিয়ৈ; পাড়া পাড়া বেড়েনো বাকসা মেলিয়ৈ; তুনুই বৈসু বৈসু বৈসু; ফাইকা বৈসু বৈসু বৈসু…বাংলা অর্থ: তুরু রুতু তুরু রু; বাঁশি বাজিয়ে; পাড়ায় পাড়ায় ঘুরবো একসাথে মিলে; আজকে বৈসু বৈসু বৈসু; এসেছে বৈসু বৈসু বৈসু।

পুরাতন বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে বরণে উৎসবমুখর পার্বত্য এলাকার আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে ত্রিপুরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মনমাতানো এই সুমধুর গান। জনপ্রিয় এই গানের তালে তালে চলছে ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য। খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলার ত্রিপুরা অধ্যুষিত পাড়া-পল্লী-শহরজুড়ে চলছে গরাইয়া নৃত্য। একইভাবে চাকমা ও মারমা নৃগোষ্ঠীর মানুষও মেতে উঠেছে পাহাড়ের প্রাণের উৎসব বৈসাবিতে।

রোববার (১২ এপ্রিল) ভোরে জলদেবীর উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল ভাসিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের প্রাণের উৎসব বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে। তিনদিনব্যাপী চলবে বর্ষবিদায় ও বরণের এই বর্ণিল উৎসবের মূল পর্ব। পুরাতন বছরের সকল দুঃখ, কষ্ট, গ্লানি, হতাশা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও ব্যর্থতাকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধির নতুন মনোবাসনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মহাধুমধামে উদযাপন করে বৈসাবি।

পার্বত্য এলাকায় বৈসাবির আনন্দের ঝড় শুরু হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই। খাগড়াছড়িতে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালীকা ত্রিপুরা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বৈসাবির। পাড়া-পল্লী সর্বত্রই শুরু হয় আনন্দ-অনুষ্ঠান। ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর বৈসু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় গত বৃহস্পতি বার। শোভাযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় দিনব্যাপী। শুক্রবার মারমা সম্প্রদায়ের উৎসব সাংগ্রাইয়ের শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ‘দ’ খেলা ও আলারী খেলার মাধ্যমে। জেলা সদরের পানখাইয়াপাড়ায় সাংগ্রাইয়ের উদ্বোধন হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রবীণদের পা ধুয়ে পুণ্যলাভ করে শিশু-কিশোর-যুবরা। আগামী মঙ্গলবার খাগড়াছড়িতে সাংগ্রাইয়ের শোভাযাত্রা ও ঐতিহ্যবাহী জলকেলী উৎসব হবে।

১৯৮৫ সালে উপজাতীয় ছাত্রদের উদ্যোগে ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু—এই তিন প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বৈসাবি নামকরণ করা হয়। বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্রের শেষ দুই দিন এবং বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ—এই তিন দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে বর্ষবিদায় ও বরণের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈসাবি উদযাপন করে উপজাতীয়রা।

বৈসাবি শুধুমাত্র একটি উৎসবই নয়, এটি যুগ যুগ ধরে লালন করছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। এই উৎসবে মানুষে মানুষে গড়ে উঠে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।

বৈসু: পার্বত্য এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী ত্রিপুরা উপজাতীয়রা তিনটি ধাপে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে উদযাপন করে বৈসু। চৈত্রসংক্রান্তির পূর্বদিনকে বলা হয় হারি বৈসু। এই দিনে ত্রিপুরা উপজাতীয়রা আগত দিনের সুখ-শান্তি কামনায় সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষ প্রার্থনা করে। এই দিনে নদী, মন্দির ও বিশেষ পবিত্র স্থানে বিধাতার উদ্দেশ্যে ফুল অর্পণ, ধূপ ও মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো হয়। গৃহপালিত গরু-মহিষকে গোসল করিয়ে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। একে অপরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় আবালবৃদ্ধবনিতা।

বছরের শেষ দিনটিকে বলা হয় বিসুমা বৈসু। এই দিনে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা ভুলে গিয়ে নতুনভাবে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হয়। কুচাই পানি (বিশেষ পবিত্র জল) ছিটিয়ে ঘরবাড়ি পবিত্র করে মহিলারা। প্রত্যেকের বাড়িতে সামর্থ্য অনুযায়ী পিঠা, মিষ্টান্ন, পাঁচন ইত্যাদি মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়। শিশু, কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা সুন্দর পোশাক পরে, সাজসজ্জা করে দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়।

নববর্ষের দিনটি বিসিকাতাল নামে উদযাপন করা হয়। এই দিনে মূলত নতুন বছরকে বরণ করা হয়। শস্য ও সম্পদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী ও নবদম্পতিরা কলসিতে পানি ও ফুল নিয়ে মুরুব্বিদের গোসল করিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে।

About dainiksatkhira24

Check Also

সুন্দরবনে মধুসংগ্রহকালে ঝড়ের কবলে পড়ে ভারতে ঢুকে পড়া ৪ মৌয়াল উদ্ধার

Spread the love রঘুনাথ খাঁ: সুন্দরবনে মধু সংগ্রহকালে ঝড়ের কবলে পড়ে দিক হারিয়ে ভারতে ঢুকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com