
নিজস্ব প্রতিনিধি: অবৈধ ইটভাটা, মাটি কাটার মহোৎসব, নদী ও কৃষিজমি ধ্বংসের শঙ্কা—এটাই আজকাল শোনা যাচ্ছে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা। একটি চক্র স্থানীয় কৃষিজমি এবং নদী থেকে মাটি কেটে, তার ওপর নির্মাণ করছে অবৈধ ইটভাটা, যা শুধু পরিবেশকেই নয়, মানুষের জীবনকেও হুমকির মধ্যে ফেলছে।
নদীর বুক চিরে গর্ত, জমি সঙ্কুচিত
সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়ন এবং খুলনার পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় যে কপোতাক্ষ নদী ছিল, তা আজ মৃতপ্রায়। নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে চরে জমতে শুরু করেছে মাটি। আর এই জমিতেই চলছে অবৈধ মাটি কাটার কাজ, যা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। দুঃখজনকভাবে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রভাবশালী একটি চক্র বেকু মেশিন দিয়ে অবাধে মাটি কেটে এসবি ও এমবিএস ভাটা তৈরি করছে। এছাড়াও ভাটার ভিতরে কাঠ কাটার সমিল বসিয়ে কাঠ কেটে ভাটার আগুনে পুড়ছে মানুষ জীবন। এই অবৈধ কার্যক্রমের কোনো সরকারী অনুমতি নেই, কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্রও নেই—তবে প্রশ্ন উঠছে, তাহলে প্রশাসন ও সরকারের তৎপরতা কোথায়?
কৃষিজমির মৃত্যু, কৃষক বিপর্যস্ত
এলাকার কৃষকরা এখন বিপদে। তাদের উপজীবিকা প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। কৃষিজমি কেটে মাটি নিয়ে যাওয়ার কারণে এখন ধান চাষ, সবজি চাষ—কিছুই আর সম্ভব নয়। বৃষ্টির সময়, সেসব জায়গায় পানি জমে চাষাবাদ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কৃষকরা ক্ষোভের সঙ্গে বলছেন, “নদী কেটে চর বানাল, চর কেটে ভাটা চালাল—এখন আমাদের বাঁচার শেষ আশাটুকুও শেষ।”
বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা: প্রশাসনের নীরবতা প্রশ্নবিদ্ধ
এলাকার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বোয়ালিয়া ব্রিজ। এই ব্রিজের খুব কাছেই অবস্থিত অবৈধ ইটভাটা, যার কারণে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ভারী যান চলাচল, মাটি বহন এবং বেকু মেশিনের কম্পনে ব্রিজের স্থায়িত্বে বিরাট প্রশ্ন উঠেছে। অথচ প্রশাসন এই গুরুতর ঝুঁকি এড়াতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি
আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ইটভাটার আশপাশে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এখানে পড়াশোনা করা কোমলমতি শিশুরা প্রতিদিন সেসব ভাটার নির্গত ধোঁয়া ও কালো ছাইয়ের মাঝে বসবাস করছে। ধোঁয়ায় শিশুরা শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, কিন্তু প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টিও উপেক্ষা করছে।
প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা: অবৈধ কার্যক্রম কি ছত্রছায়ায়?
এমনকি যখন দিনের আলোতে বেকু মেশিন চলছে, তখন কোথাও কোনো অভিযান, উচ্ছেদ বা প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না। এটি প্রশ্ন তোলে—তবে কি প্রশাসন এই অবৈধ সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় কাজ করছে? স্থানীয়রা মনে করছেন, এই ভয়াবহ অবস্থা প্রশাসনের অজ্ঞানতা কিংবা সমর্থনে এগিয়ে চলেছে।
আইন লঙ্ঘন: প্রজন্মের জন্য বিপদজনক পরিণতি
পরিবেশ ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী থেকে মাটি কাটা এবং কৃষিজমি ধ্বংস করা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন, এবং নদী রক্ষা নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। এর পরিণতি বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্যও ভয়াবহ হতে পারে। পরিবেশের সুরক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রমের শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে এটি দেশের কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থার জন্য কালো অধ্যায় হয়ে দাঁড়াবে।
এলাকাবাসীর দাবি: দ্রুত ব্যবস্থা নিন!
এলাকার জনগণের জোর দাবি—অবিলম্বে অবৈধ মাটি কাটার কাজ বন্ধ করতে হবে, এবং অবৈধ ইটভাটাগুলিকে উচ্ছেদ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি প্রশাসন এই অবস্থা ঠিক না করে, তবে বয়লিয়া ব্রিজ এলাকা শুধু নদী এবং জমি হারাবে না, বরং আইনের শাসনের শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়ে যাবে।
অথচ, এসবি ও এমবিএস ভাটার মালিকের অবস্থান রহস্যজনক
এসবি ভাটার মালিক ডালিম সরদার ও এমবিএস মিনারুল ইসলাম- এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসন কোথায়? জনগণ কীভাবে প্রতিকার পাবে?
এবারের সংকটটি যদি অবিলম্বে সমাধান না করা হয়, তাহলে এর পরিণতি হতে পারে আরও ভয়াবহ। প্রশাসনের উচিত দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া, আইন প্রয়োগ করা এবং পরিবেশ ও কৃষিজমির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আর এই প্রতিবেদনটি শুধু একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হতে পারে না—এটি একটি আহ্বান, একটি আন্দোলন, এবং সবার জন্য সচেতনতার বার্তা।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
