
শাহরিয়ার কবির:ভোরে পাইকগাছার আকাশ ঢেকে যায় ঘন কালো ধোঁয়ায়। দূর থেকে কুয়াশার মতো দেখালেও কাছে গেলে বোঝা যায়—এটি ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া। উপজেলার প্রায় ১৫টি ইটভাটার অধিকাংশই পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নি নিরাপত্তা বা আইনি অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলমান। অথচ এই ভাটাগুলি বাসস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ফসলি জমির কাছাকাছি অবস্থান করছে—যা আইনত নিষিদ্ধ।
চিমনির নিচে দাঁড়িয়ে আজ আইন যেন অসহায়। ধোঁয়ার আড়ালে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যারা পরিবেশ আইন, কৃষিজমি সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্য—সবকিছুকেই উপেক্ষা করে ইট তৈরি করছে। অনেকে অভিযোগ করছেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নয়, বরং নীরব উপস্থিতিতেই অবৈধ ভাটাগুলো চলছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—কার ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠেছে এই ধোঁয়ার সাম্রাজ্য?
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, শুকনো মৌসুমে রাস্তা মাটিতে ঢাকা পড়ে, বৃষ্টিতে তা কাদা হয়ে যায়, ফলে সড়ক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভাটায় নেই ফায়ার এক্সটিংগুইশার, প্রশিক্ষিত কর্মী বা জরুরি ব্যবস্থাপনা। নিম্নমানের কাঠ ও জ্বালানি ব্যবহারের কারণে যে কোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে।
চাঁদখালী, গদাইপুর, রাড়ুলী ও হরিঢালী ইউনিয়নে বর্তমানে ১৩টি ইটভাটা কৃষিজমির ওপর অবস্থিত। এর মধ্যে মাত্র একটি বৈধ, বাকি ১২টি সম্পূর্ণ অবৈধ। রাড়ুলীর দুটি ভাটা মালিক দাবি করেন, তারা সাতক্ষীরা জেলার আওতাভুক্ত, তাই তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অথচ এই ভাটাগুলি নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালি উত্তোলন করছে।
গত বছর সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহেরা নাজনীন এক সপ্তাহের মধ্যে অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধ না করলে আইন অনুযায়ী ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সভায় প্রশাসন, ভাটা মালিক ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী জানান, তিনি সদ্য যোগদান করেছেন এবং শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে। “অবৈধভাবে কোনো ইটভাটা চলতে দেওয়া হবে না। বৈধ না হলে তা ধ্বংস করা হবে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আসিফুর রহমান বলেন, “পাইকগাছা ক্রিটিক্যাল এলাকা হওয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিযান চালানো হবে। গত বছর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এবার অবশ্যই অভিযান হবে।”
পাইকগাছার আকাশে প্রতিদিন ধোঁয়া ওঠছে। কিন্তু যদি এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে শুধু ইট পোড়াবে না—মানুষের জীবন, কৃষি ও পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্থানীয়দের দাবি, এবার অভিযান কাগজে নয়, মাঠে দৃশ্যমান হোক।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
