তালায় মালচিং পেপার ব্যবহার করে ২৮ কৃষকের অমৌসুমী তরমুজ চাষ

Spread the love

তালা প্রতিনিধি :তরমুজ রসে ভরপুর, লাল টুকটুকে ও প্রাণজুড়ানো এই ফলের বিশ্বজুড়ে রয়েছে বর্ণিল কদর। তবে প্রথাগত বা সাধারণ ধারণায় ‘তরমুজ’ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চৈত্র-বৈশাখ কিংবা প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহ। কিন্তু প্রকৃতির সেই বাধা ও সনাতন নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় এক অভাবনীয় সাফল্য ঘটিয়েছেন অদম্য নারী উদ্যোক্তা শিরিনা খাতুন সহ ২৮ কৃষক। মালচিং পেপার ব্যবহার করে মাচা পদ্ধতিতে অমৌসুমি তরমুজ চাষ করে তারা কেবল নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরাননি, বরং পুরো উপকূল জুড়ে সৃষ্টি করেছেন এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও অনুপ্রেরণার গল্প।জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাতক্ষীরার মাটিতে শিরিনা খাতুন তাঁর ৪৩ শতক জমিতে শুরু করেন অসময়ের তরমুজ চাষ। তবে সনাতন পদ্ধতিতে নয়, তিনি গ্রহণ করেছেন পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি।

জমির আর্দ্রতা ধরে রাখতে, ক্ষতিকর আগাছা সম্পূর্ণ দমন করতে এবং ক্ষতিকারক পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কমাতে তিনি ব্যবহার করেছেন বিশেষ ‘মালচিং পেপার’। মাটিতে ফল না ফেলে তিনি তৈরি করেছেন সুদৃঢ় মাচা। ক্ষতিকর মাছি পোকা বা ভারি বৃষ্টিপাত থেকে রক্ষা করতে লতা থেকে ঝুলন্ত প্রতিটি তরমুজকে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সূক্ষ্ম নেটে। বর্তমানে তাঁর খেতে ঝুলছে শত শত সুন্দর জালে মোড়ানো তরমুজ। পুরো খেত যেন এক সবুজের সমারোহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির এক নতুন স্বপ্ন ক্ষেত্র।

​শিরিনা খাতুনের নতুন এই উদ্যোগে তার ৪৩ শতক প্রযুক্তির ব্যবহার মাচা পদ্ধতি, মালচিং পেপার ও ফ্রুট ব্যাগিং মোট খরচ (এখন পর্যন্ত): প্রায় ৬০,০০০ টাকা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ৬ তারিখেই প্রথমবারের মতো খেত থেকে তরমুজ তোলা শুরু হবে। বাজারে অসময়ের এই রসালো তরমুজের চড়া চাহিদা ও বাজারমূল্য দুটোই বহুগুণ বেশি থাকায়, ভালো মুনাফা বা বাম্পার লাভের আশা করছেন উদ্যোক্তা শিরিনা ও স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তারা।

একসময় উপকূলীয় নোনা কিংবা অমৌসুমী মাটিতে তরমুজ চাষ ছিল প্রায় অসম্ভব এক কাল্পনিক ব্যাপার। কিন্তু শিরিনা সহ ২৮ জন উদ্যোগ নিয়ে প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছা আর সঠিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে যেকোনো মাটিতেই সোনা ফলানো সম্ভব। উন্নয়ন সংস্থা উন্নয়ন প্রচেষ্টার কৃষি কর্মকর্তা নয়ন হোসেন জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন পিকেএসএফ ও উন্নয়ন প্রচেষ্টা এর Special Program-Development (Agriculture) অর্থাৎ SP-D(Agriculture) এর সহযোগিতায় সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া, ভায়ড়া ও সুকদেবপুর গ্রামে প্রায় ২১ বিঘা জমিতে ২৮ জন কৃষক ইয়োলো ড্রাগন ও কার্নিয়া জাতের তরমুজ চাষ করেছে। এটা একটা অমৌসুমী তরমুজ চাষের বড় ক্লাস্টার। তরমুজ উৎপাদিত হবে প্রায় ৪২০০০ কেজি (বিয়াল্লিশ হাজার) কেজি তরমুজ, যার বাজার মূল্য ১৯ লাখ টাকা। ১ বিঘা তরমুজ চাষে খরচ হয় প্রায় ৪০-৪৫ হাজার টাকা আর বিক্রয় হয় ১ লাখ থেকে ১.২ লাখ টাকা পর্যন্ত।

তরমুজ চাষটি অত্র এলাকায় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। অনেক কৃষক আগামীতে চাষাবাদ করবে। সকল ফল ব্যাপারী ও ফরিয়ারা কেজি দরে কিনে ট্রাকে করে খুলনা ও ঢাকায় নিয়ে যায়। অমৌসুমী তরমুজ চাষ শেষ হলে উক্ত জমিতেই নতুন করে কোনো চাষ না দিয়ে মালচিং পেপার এর উপর দিয়ে লাউ, শসা এই গুলো কৃষকরা চাষাবাদ করবে। তরমুজ বিক্রি শুরু হলে তালা – আঠারোমাইল এর মেইন রোডের পাশেই কৃষকরা অনেকেই তরমুজ বিক্রি করে। লোকজন যাবার পথে গাড়ি থামিয়ে কিনে নিয়ে যায়।

​তালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাজেরা খাতুন বলেন, একসময় সাতক্ষীরার উপকূলে অসময়ে তরমুজ চাষ ছিল খুবই দূরহ ব্যাপার। কিন্তু আধুনিক কৃষির হাত ধরে এখন সবকিছুই সম্ভব, আর আমাদের নারী উদ্যোক্তা শিরিনা খাতুন সহ ২৮ জন সেটি বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছেন উন্নয়ন প্রচেষ্টার সহযোগিতায়। অসময়ে তরমুজ চাষ করলে ফলনের সাথে সাথে বাজারে চড়া দামও পাওয়া যায়, যা কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত স্বাবলম্বী করে তোলে।

About dainiksatkhira24

Check Also

হাজরাকাটি ব্লাড ডোনার্স ক্লাবের ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও আলোচনা সভা

Spread the loveতালা প্রতিনিধি: তালা উপজেলার হাজরাকাটি ব্লাড ডোনার্স ক্লাবের ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিনামূল্যে রক্তের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com