
নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওহিদুজ্জামান শামীম হত্যা মামলায় ফজলুল হক আমিনী গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক মব সন্ত্রাসে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, এক জন প্রতিনিধির স্বামী ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার কথা ছড়িয়ে তাদের ওপর হামলা, মারধর, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং লুটপাট চালানো হয়েছে। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন ৭৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম। ফজলুল হক আমিনী ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পরবতৃী সময়ে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে আলোচনায় আসে।
মঙ্গলবার দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামে শহিদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। বাড়ির মূল ফটকে তালা ঝুলছে। একসময় বীর নিবাস হিসেবে পরিচিত পাকা বাড়িটির চারপাশে এখন লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১৫ মে পারুলিয়া মাছবাজারে প্রকাশ্যে মব সন্ত্রাসের শিকার হন বীর মুক্তিযোদ্ধ শহিদুল ইসলাম। ইসলাম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটুক্তির অভিযোগ তুলে তাকে ফজলুল হক আমিনী লোকজন নিয়ে তাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে একটি পুরাতন মামলায় প্রায় চার মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। এরপরও নিরাপত্তাহীনতা ও পুনরায় হামলার আশঙ্কায় দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন তার প্রতিবেশীরা।
প্রতিবেশী হাফিজুর রহমান বলেন, শহিদুল ইসলাম ভালো মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। পরে তাকে কারাগারেও থাকতে হয়েছে। এসব ঘটনার পর বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়ায় এখন তার বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
শহিদুল ইসলামের যুদ্ধসঙ্গী বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ হাবিবুল বাসার বলেন, ১৯৭১ সালে তারা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। শহিদুল ইসলামকে তিনি ভালো মানুষ হিসেবেই জানেন। জীবনের শেষ বয়সে তাকে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বাধীন দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এমন পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুধু শহিদুল ইসলাম নন, দেবহাটার কোমরপুর গ্রামে পারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১.২.৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা সদস্যের স্বামী কুতুব উদ্দীন কাদেরীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতেও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে ফজলুল হক আমিনী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
কুতুব উদ্দীন কাদেরীর স্ত্রী নুরবানু কাদেরীর অভিযোগ, ২০২৫ সালের ৪ ও ৫ অক্টোবর দুই দফায় তাদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলার অভিযোগ তুলে এ হামলা চালানো হয়েছিল। লুটপাট চালানো হয় তার পানির প্রকল্পে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। ভাংচুর করা হয় তার দোতলা বাড়ী। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নুরবানুর অভিযোগ, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় প্রতিকার পাওয়ার পরিবর্তে তার স্বামীকে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কুতুব উদ্দীন আওয়ামী লীগ সমর্থক হওয়ায় তাকে এভাবে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ফজলুল হক আমিনীর ভয়ে পরিবার টি এখনও আতংকে রয়েছে।
কোমরপুরের ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে দেবহাটার কুলিয়া ইউনিয়নের পুষ্পকাটি গ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থক সোহাগ হোসেনের বাড়িতেও হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ধর্মের শত্রু আখ্যা দিয়ে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে শতাধিক লোক সেখানে জড়ো হন। এ সময় সোহাগ হোসেনকে মব সৃষ্টি করে বেপরোয়া মারধর করা হয় এবং তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সোহাগ হোসেন জানান, হামলার পর থেকে তিনি অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে মামলা করার সাহস পাননি বলেও দাবি করেন তিনি। সোহাগ হোসেন বলেন সেই মব সন্ত্রাসের পর থেকে সে এখনও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নিরাপত্তার অভাবে তিনি আইনগত সহায়তা নিতে সাহস পাননি।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে পারুলিয়া বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সাধারন মানুষ জানান,ফজলুল হক আমিনী একজন ভয়ঙ্কর প্রকৃতির লোক। সে গ্রেপ্তার হয়ে জেল হাজতে থাকলেও এখনও এলাকায় আতংক কাটেনি। তার পক্ষে কতিপয় ব্যক্তি স্যোশাল মিডিয়ায় মুক্তির দাবীতে প্রচারনা চালাচ্ছে। মঙ্গলবার দিনভর এলাকায় ঘুরে সাধারন মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে ফজলুল হক আমিনী একাধিক মব সন্ত্রাসের খবর।
এসব বিষয়ে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো: আশরাফুল আলম বলেন, ফজলুল হক আমিনী একটি আলোচিত মামলার প্রধান আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন। সে পারুলিয়ার ওহিদুজ্জামান শামীম হত্যার বিষয়ে নিজের দোষ স্বিকার করে আদালতে স্বিকারোক্তি দিয়েছেন। বর্তমানে সে জেল হাজতে আছে। অন্য আরও দুই আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগের বিষয় সামনে আসায় তা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কোন সংক্ষুব্দ ব্যক্তি আইনী সহায়তা নিতে চাইলে তাকে সহায়তা করা হবে। থানায় অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটার বড়শান্তা গ্রামের ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওহিদুজ্জাম শামীমকে তিন দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ফজলুল হক আমিনী ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করে লোকজন জোগার করে সখিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাতে হামলা করে চিকিৎসাধীন শামীমকে নির্যাতন করা হয়। পুলিশ উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ফজলুল হক আমিনী এর আগে একাধিক মব সন্ত্রাস ঘটালেও কোন প্রকার আইনী ঝামেলায় পড়তে হয়নি। উল্টো বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহিলা মেম্বরের স্বামী কুতুব উদ্দীনকে নাশকতা মামলায় পুলিশ দিয়ে জেলখাটাতে পেরেছিলেন। তবে এবার শামীম হত্যা মামলায় প্রথম আইনের মুখো মুখি হতে হয়েছে তাকে। শামীম হত্যার ঘটনায় নিহতের ভাই বড় শান্তা গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে ফজলুল হক আমিনী কে প্রধান কওে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ ২৫০ জনের নামে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। পুলিশ এঘটনায় ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করে। সে আদালতে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বিকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। দেবহাটা এলাকায় মব সন্ত্রাসের প্রধান ফজলুল হক আমিনী উজেলার দক্ষিন পারুলিয়া গ্রামের কারী রুহুল আমিনের ছেলে। সে পেশায় ভাড়ায় মটর সাইকেলচালক ও কসাই হিসেবে পরিচিত।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানান, শামীম হত্যার সাথে জড়িত ফজলুল হক আমিনীর সহযোগীদের ভিড়িও বা ছবি দেখে সনাক্তের চেষ্টা চলছে। পুলিশ অপরাধীদের ধরতে কাজ করছে।
দৈনিক সাতক্ষীরা সব সময় সবার আগে
