গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ: সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের তীব্র লবণাক্তত পানির প্রভাবে হাজার হাজার মানুষ এক নীরব স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে মানুষের শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ ‘সুরুল’ বা কুঁচকি অঞ্চল (Pelvic Region) এবং নারীদের জরায়ুতে মারাত্মক সংক্রমণ ও চর্মরোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গ্রামীণ মানুষের চিরন্তন লজ্জা ও সামাজিক ট্যাবুকে পুঁজি করে এই নীরব ব্যাধি প্রকট আকার ধারণ করলেও, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় এতদিন সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টির বাইরেই থেকে গেছে এই তীব্র সংকট। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি উপকূলীয় এলাকায় অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই অঞ্চলের নারীদের একটা বড় অংশ দীর্ঘক্ষণ চিংড়ি ঘের কিংবা নদীর অতিরিক্ত লবণাক্ত পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে এই লবণাক্ত পানি সংবেদনশীল অঙ্গে লেগে থাকার কারণে সেখানে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস বাসা বাঁধছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ’ (PID) এবং তীব্র চর্মরোগ ‘টিনিয়া ক্রুরিস’ (Tinea Cruris) বলা হলেও স্থানীয় চিকিৎসকেরা গ্রামীণ মানুষের মুখের ভাষায় একে চিহ্নিত করছেন “সুরুল লাগা”, “সুরুল ফোলা” কিংবা “কুঁচকি নামা” হিসেবে। স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুঁচকি বা তলপেটের দুই পাশের সংযোগস্থলে প্রচণ্ড চুলকানি, ক্ষত এবং লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে ওঠার মতো তীব্র যন্ত্রণায় তারা দীর্ঘদিন ভুগছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রেও কুঁচকি অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগ ও টিউমার সদৃশ ফোলা ভাব দেখা দিচ্ছে। কিন্তু রোগটি শরীরের অত্যন্ত গোপন ও সংবেদনশীল অংশে হওয়ায় গ্রামীণ নারীরা লজ্জায় পরিবারের অন্য সদস্য বা পুরুষ চিকিৎসকদের কাছে মুখ খোলেন না। ফলে কোনো ধরনের সুচিকিৎসা না পেয়ে রোগটি ভেতরে ভেতরে আরও জঘন্য রূপ নিচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে জরায়ুর বড় ধরনের ক্ষতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট এবং পানির অতিরিক্ত লবণাক্ততাই এই সংকটের মূল কারণ। এই বিপর্যয় রোধে এখনই উপকূলীয় নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বিশেষায়িত মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। তা না হলে সুন্দরবন সংলগ্ন এই জনপদের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। উপকূলীয় জনপদের বাস্তবতায় নারীদের একটি বড় অংশ সংসারের পাশাপাশি চিংড়ি ঘের, কৃষিকাজ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নদী-খালের আশপাশের বিভিন্ন কাজে যুক্ত। এসব কাজে দীর্ঘ সময় পানি, কাদা, ভেজা কাপড় ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের সংস্পর্শে থাকতে হয়। বিশেষ করে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এবং গোসলের সুবিধা না থাকলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেক নারী জানান, দিনের পর দিন একই ধরনের অস্বস্তি, চুলকানি বা জ্বালাপোড়া থাকলেও তারা বিষয়টি কাউকে বলতে চান না। কেউ কেউ স্থানীয় ফার্মেসি থেকে নিজের মতো করে ওষুধ বা মলম ব্যবহার করেন। সাময়িকভাবে উপসর্গ কমে গেলেও সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় হয় না ফলে আবার ফিরে আসে। এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ওষুধ ব্যবহার করে ও নতুন জটিলতা তৈরি হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এখনো শরীরের গোপন অঙ্গ নিয়ে কথা বলাকে অনেক পরিবার অস্বস্তিকর মনে করে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই সংকোচ আরও বেশি। ফলে অনেকেই ব্যথা, চুলকানি, অস্বাভাবিক স্রাব, ফোলা, ক্ষত কিংবা প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ প্রকাশ করেন না।