জেমস আব্দুর রহিম রানা:দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের জলাবদ্ধতার অভিশাপ পেরিয়ে যশোর-খুলনা অঞ্চলের মানুষ অবশেষে দেখছেন মুক্তির আলোর ঝলক। ভবদহ এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছেন—অবশেষে হয়তো তারা ফিরে পাবেন শুকনো জমি, ফসল ও জীবনের স্বাভাবিক গতি।
শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে ভবদহ ২১-ভেন্ট সুইচগেটের পাশে এক বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলাম। ভিডিও কলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বলেন, “ভবদহের জলাবদ্ধতা শুধু স্থানীয় সংকট নয়—এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ও কৃষি অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাই সরকার সেনাবাহিনী, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এর টেকসই সমাধানে কাজ করছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ভবদহের পানি অপসারণের জন্য ছয়টি নদী—ভবদহ, ভৈরব, ত্রিমোহিনী, হরি, অপদা ও বেতনা—খননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। এই কাজ সম্পন্ন হলে স্থানীয় কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলাম বলেন, “ভবদহ সমস্যা শুধু পানি নিষ্কাশনের বিষয় নয়—এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা একসঙ্গে কাজ করলে ভবদহের জলাবদ্ধতা ইতিহাস হয়ে যাবে।”
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মামুন উর রশিদ বলেন, “ভবদহের মতো চ্যালেঞ্জিং কাজ হাতে নিতে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি সবসময় থাকে। আমরা দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করছি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করব।”
তিনি আরও জানান, “আগামী রবিবার থেকেই মাঠ পর্যায়ে পূর্ণমাত্রায় কাজ শুরু হবে। সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দল নদী খননের পাশাপাশি বাঁধ মেরামত, স্লুইসগেট সংস্কার ও পানি প্রবাহের ভারসাম্য রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেবে।”
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, “দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীগুলো প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় ছিল। খনন সম্পন্ন হলে প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরে আসবে, যার ফলে কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক বিএম আব্দুল মোমিন, মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত তামান্না, কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেক্সোনা খাতুন, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ এবং মনিরামপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা ফজলুল হক প্রমুখ।
মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার ফারুক মিন্টু বলেন, “ভবদহের পানিতে আমাদের ইউনিয়নের বিশাল অংশ বছরজুড়ে ডুবে থাকে। মানুষ ঘর হারায়, জমি হারায়। আজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু হওয়ায় মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে।”
অভয়নগরের আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন শেখ বলেন, “ভবদহের মানুষের কষ্ট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এবার সেনাবাহিনী মাঠে নামায় আমরা আশাবাদী, এবার আর কাজ অর্ধসমাপ্ত থাকবে না।”
কেশবপুরের বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম বলেন, “জলাবদ্ধতার এই সমস্যা রাজনীতি নয়, মানবতার প্রশ্ন। সবাই মিলেই এই কাজকে সফল করতে হবে।”
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিৎ বাওয়ালী বলেন, “এটি আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফল। সেনাবাহিনী মাঠে নামায় জনগণের মনে আস্থা ফিরে এসেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “আমার তিন বিঘা জমিতে পাঁচ বছর ধান ফলাতে পারিনি। এখন আশা করছি আবার জমিতে চাষ শুরু করতে পারব।”
অভয়নগরের গৃহবধূ শাহিদা খাতুন বলেন, “বছরের ছয় মাস আমাদের ঘরে পানি থাকে। শিশুদের স্কুলে পাঠানো যায় না। এখন মনে হচ্ছে আমরা বাঁচব।”
কেশবপুরের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “জলাবদ্ধতার কারণে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। সেনাবাহিনী মাঠে নামায় ব্যবসায়ীরা আশায় বুক বেঁধেছে।”
স্থানীয় তরুণ সমাজকর্মী হাসানুজ্জামান বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদী পুনঃখননের দাবি করে আসছি। এখন বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় তরুণ সমাজও স্বেচ্ছাশ্রমে সহযোগিতা করবে।”
প্রেসক্লাব মনিরামপুরের সভাপতি মজনুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন সাংবাদিকরা ভবদহ সমস্যা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন। এখন মাঠে কাজ শুরু হওয়ায় সাংবাদিক সমাজও জনগণের পাশে থাকবে।”
এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেনাবাহিনী নদী খননের পাশাপাশি অপদা সুইচগেট ও ভবদহ ২১ ভেন্ট গেট সংস্কার করবে বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অপদা সুইচগেটটি বহু বছর ধরে কার্যকর ছিল না। এতে এলাকার বিশাল অংশের পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়েছে। এখন খনন ও গেট সংস্কারের কাজ শুরু হলে স্রোতধারা ফিরে আসবে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণেরও সুবিধা হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পুনঃখনন কাজের মাধ্যমে প্রতিটি নদী গড়ে ২ থেকে ৪ মিটার গভীর করা হবে। এতে পানি প্রবাহের গতি বাড়বে এবং ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষি পুনরুজ্জীবিত হবে।
ভবদহ অঞ্চলের স্থানীয়রা সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে “আশার শেষ আলো” হিসেবে দেখছেন। বহু বছর ধরে তারা বিভিন্ন সময় আন্দোলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও গণঅনশন করেও টেকসই সমাধান পাননি। এখন সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে প্রকল্প শুরু হওয়ায় তাদের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ভবদহ সমস্যা নিয়ে তথ্যনির্ভর সংবাদ ও মাঠ পর্যায়ের গবেষণা করে আসছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য এবং দৈনিক চেতনায় বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ও জাতীয় দৈনিক নাগরিক ভাবনা এবং ডেইলি কান্ট্রি টুডের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানা।
তিনি বলেন, “ভবদহ সমস্যা কোনো একদিনের নয়—এটি দীর্ঘ পরিকল্পনাহীনতা, নদী দখল, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও জনগণের বঞ্চনার ফল। আমি মাঠে গিয়ে দেখেছি, মানুষ কাঁদছে—তারা ফসল, ঘর, জীবিকা সব হারিয়েছে। সেনাবাহিনীর হাতে এই প্রকল্প মানে জনগণের বিশ্বাসের প্রতীক। তবে কাজটি যেন স্বচ্ছতা ও স্থানীয় মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে হয়—সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, “ভবদহের সমাধান শুধু খনন নয়—এটি একটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নীতি বাস্তবায়নের পরীক্ষা। পরিবেশের ভারসাম্য, প্রাকৃতিক প্রবাহ ও নদী তীরের জীবনযাত্রা সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দোয়া পরিচালনা করেন মাওলানা গাউছুল আজম হাদী। পরে অতিথিরা প্রতীকীভাবে মাটি কেটে নদী খননের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ তদারকিতে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। এতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন।
ভবদহ এখন আর কেবল দুর্ভোগের প্রতীক নয়—এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের নতুন জীবনের আশার প্রতীক। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নদীগুলোর পুনঃখনন বাস্তবায়িত হলে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সবাই ফিরে পাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, ফসলের রঙ ও মাটির গন্ধ।
---