
নিউজ ডেস্ক:
ব্যাংক খাতে জালিয়াতি ও পাচারের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ আদায় না হওয়ায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে তা এখন ঋণাত্মক (নেগেটিভ) পর্যায়ে চলে গেছে। একই সঙ্গে আয় কমে গিয়ে পুরো ব্যাংক খাত এখন গভীর লোকসানের মুখে পড়েছে।
গত মঙ্গলবার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫’ থেকে এসব উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জালিয়াতির ঋণ বিতরণ ও দুর্বল তদারকির কারণে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশই পুঞ্জীভূত রয়েছে মাত্র ৫টি ব্যাংকে। বাকি ৪৮ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে অন্য ৫৭টি ব্যাংকে। এছাড়া বেশির ভাগ ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় সম্পদের গুণগত মান বহুলাংশে কমে গেছে।
ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান খারাপ হওয়ায় এবং খেলাপি ঋণ বাড়ায় ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে গেছে।
২০২৪ সালে ব্যাংক খাতে মূলধন ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সাল শেষে কমে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী যেখানে ন্যূনতম ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন থাকার কথা, সেখানে গড় হিসাবে ব্যাংকগুলোর কোনো মূলধনই অবশিষ্ট নেই।
২০২৪ সালে সম্পদ থেকে আয় (আরওএ) ছিল দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে ঋণাত্মক ৪ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমেছে। একইভাবে ২০২৪ সালে মূলধন থেকে আয় (আরওই) ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা কল্পনাতীতভাবে কমে ঋণাত্মক ২৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মূলধন না থাকায় কোনো বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না, উল্টো ব্যবস্থাপনা খরচের কারণে লোকসান বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ইউনিট থেকে টাকা পাচারের পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকেও বৈদেশিক মুদ্রায় বড় ধরনের জালিয়াতি হয়েছে। অফশোর ইউনিটের এসব ঋণের সিংহভাগই বিদেশ থেকে ধার বা আমানত হিসেবে আনা হয়েছিল। এখন সেই ঋণ আদায় না হওয়ায় দেশের বৈদেশিক দায়ের পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক আর্থিক খাতে বাংলাদেশের বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হচ্ছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও দেশের ডজনখানেক ব্যাংক এখনো বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়াও এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।