নিজস্ব প্রতিনিধি: বছর দশেক আগে দেশ বিভাগের পরেও ইছামতি নদীর দুই তীরে শারদীয় দূর্গাপূজার বিজয়া দশমী উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলা বসত। দেবহাটার টাউনশ্রীপুর থেকে ভারতের টাকি পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ উৎসবে দুই বাংলার লাখো মানুষের সমাগম হতো। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও ভাববিনিময়ের পাশাপাশি উৎসবকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে বসত নানা ধরনের দোকানপাট কথা গুলো বলছিলেন, বিসর্জনে আসা কর্ণ বিশ্বাস, পারুল বিশ্বাস ও সুভাষ ঘোষ ।
তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ মিলনমেলা দুই বাংলার মানুষের সম্প্রীতির প্রতীক। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নিরাপত্তার কারণে সেই চিরচেনা দৃশ্য আর দেখা যাচ্ছে না। এবারও নদীর দুই পাড়ে মানুষের উপস্থিতি থাকলেও মিলনমেলার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেকে।
এদিকে বুধবার (২১ অক্টোবর) বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের দেবহাটা উপজেলার টাউনশ্রীপুর ও ভারতের টাকির নদীতীরে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাসনাবাদ, টাকি ও হিঙ্গলগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিমা বিসর্জনের জন্য ইছামতী নদীতে আনা হয়। নদীর শূন্যরেখায় ডিঙি নৌকায় লাল পতাকা উড়িয়ে দুই দেশের সীমানা চিহ্নিত করতে দেখা যায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে।ভারতের পাড়ে প্রতিমা বিসর্জন ও নৌযানে মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়লেও বাংলাদেশের পাড় থেকে কাউকে নৌকা নিয়ে নদীতে নামতে দেওয়া হয়নি। সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টহল ও নজরদারি জোরদার করেন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব শেষ হয়। সন্ধ্যার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।মিলনমেলা দেখতে এসে হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন অনেক দর্শনার্থী। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনের স্মৃতি ও দুই বাংলার মানুষের মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও এবারও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
দেবহাটা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ ঘোষ বলেন, প্রতিবছর ন্যায় এবছরও দেবহাটা উপজেলায় ২১ টি প্রতিমা বিসর্জন হয়েছে । এই প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে একসময় ওপার বাংলা ওপারে মিলন মেলায় পরিনত হত । তার ভাষ্য, ইছামতী নদীতে দুই বাংলার ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা বিসর্জন ও মিলনমেলাটি মূলত ২০১৭ সালের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা কিংবা নিরাপত্তার কারণে এটি প্রায় ৯ বছর ধরে বন্ধ আছে। তবে উভয় পারের মানুষ নিজ নিজ জলসীমায় ও দূরত্ব বজায় রেখে প্রতিমা বিসর্জন করে থাকেন।
বন্ধ হওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুদেশের আইনি জটিলতা, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বড় আকারে একত্রে মেলা বসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর থেকে বর্তমান সময় পর্যান্ত দু দেশের জলসীমায় থেকে সবাই নিজ নিজ প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করেন।
দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বলেন, আসন্ন শারদীয়া দূগাপূজা ঘিরে দেবহাটা প্রশাসনের প্রস্তুতি ভাল ছিল। আজ বুধবার অর্থাৎ বিসর্জনের দিনে সকাল থেকে কঠোর নিরাপতায় ইছামতি তীরে আন্তজার্তিক সীমানা আইন মেনে নিজ জলসীমানায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে । তবে একসময় বিসর্জনের দিনে দুই বাংলার মিলন মেলা থাকলেও আন্তজার্তিক আইনি জটিলতার কারণে তা বহু বছর বন্ধ আছে ।
সাতক্ষীরা-১৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবিদ নওশাদ বলেন, প্রতিবছরের মত এবারও ইছামতিতে জলসীমনায় প্রতিমা বির্সজন দেওয়া হয়েছে । স্থলে নিরাপর্তার পাশাপাশি নদীতে স্টিড বোর্ডে টহল ডিউটি করা হচ্ছে । কোথাও কোন অপৃতিকর ঘটনা না ঘটে সে জন্য বিজিবি সজাক রয়েছে ।
এ সময় বাংলাদেশের সীমান্তপাড়ে উপস্থিত ছিলেন,সাতক্ষীরা-১৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবিদ নওশাদ ,দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহাদেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন, দেবহাটা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ ঘোষ, দেবহাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি মীর খায়রুল আলম, পারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক বাবু, দেবহাটা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বকুল, নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।