শাহরিয়ার কবির: মাঠে ঘাম ঝরান বাবা, ঘরে নীরবে সংসার সামলান মা। অভাব-অনটনের সংসারে স্বপ্ন দেখাটা যেখানে বিলাসিতা, সেখানেই বই-খাতা হাতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে মো. ইমতিয়াজ হাসান শিহাব। কৃষক বাবার সন্তান সেই ইমতিয়াজ এবার ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে প্রমাণ করেছে—অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে দারিদ্র্য স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের মৌলিক গ্রামের বাবা সোহেল রানা সবুজ ও মা মমতাজ বেগম এর সন্তান ইমতিয়াজ। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সে বড়। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। সংসারে স্বচ্ছলতা না থাকলেও ছেলের স্বপ্নে কখনো কৃপণতা করেননি বাবা-মা। নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
ইমতিয়াজ কেজি এইচ এফ মৌখালী ইউনাইটেড একাডেমি থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তার এই সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।
তবে ইমতিয়াজের কাছে এই জিপিএ-৫ কোনো শেষ গন্তব্য নয়; বরং স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ। ভবিষ্যতে সে চিকিৎসক হতে চায়। আর সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়।
ইমতিয়াজ বলে, “আমি একটি গরিব পরিবারের সন্তান। অনেক কষ্ট ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আজ এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছি। আমার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মা-বাবা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। আমি এই সাফল্যকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে চাই। ভবিষ্যতে একজন ভালো ডাক্তার হয়ে যারা অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারে না, তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে চাই।”
ইমতিয়াজের স্বপ্নের কথা শুনলে বোঝা যায়, তার কাছে ডাক্তার হওয়া শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। নিজের পরিবারের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখা এই তরুণ জানে, অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পাওয়ার কষ্ট কতটা নির্মম হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে দরিদ্র ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চায় সে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার মণ্ডল বলেন, “ইমতিয়াজ আমাদের বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী, বিনয়ী ও ভদ্র শিক্ষার্থী। সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত এবং পড়াশোনার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। তার আচরণ ও শৃঙ্খলাবোধও ছিল প্রশংসনীয়।”
তিনি বলেন, “ইমতিয়াজের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। তার বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালান। এমনও সময় গেছে, যখন পরিবারের পক্ষে বিদ্যালয়ের খরচ ঠিকমতো বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা ইমতিয়াজকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সে নিজের লক্ষ্য থেকে কখনো সরে যায়নি।”
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, “বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ইমতিয়াজের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। প্রয়োজনের সময় তাকে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছি। আজ তার জিপিএ-৫ অর্জন শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, আমাদের বিদ্যালয়ের জন্যও গর্বের বিষয়।”
ইমতিয়াজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আমি চাই ইমতিয়াজ তার এই সাফল্যকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাক। সে ভবিষ্যতে একজন ভালো ডাক্তার হোক এবং চিকিৎসাবঞ্চিত, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
কৃষকের ঘামে ভেজা মাঠ আর মায়ের মমতায় গড়ে ওঠা ইমতিয়াজের পথচলা এখন নতুন অধ্যায়ের দিকে। সামনে কঠিন পথ, প্রয়োজন আরও অধ্যবসায় ও পরিশ্রম। কিন্তু যে ছেলে অভাবকে পেছনে ফেলে জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারে, তার স্বপ্নও নিশ্চয়ই থেমে থাকবে না।
কৃষক বাবার ঘর থেকে উঠে আসা ইমতিয়াজ এখন শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায় না—একদিন সাদা অ্যাপ্রোন পরে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে চায়, মানুষের সেবা করার স্বপ্নই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।