প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ৩, ২০২৬, ২:১৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১২:৩৭ পি.এম

নিউজ ডেস্ক:
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও প্রকাশ্যে খুব একটা সমালোচনায় যায়নি ভারত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের নীতির বিষয়ে নয়াদিল্লির বক্তব্যে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি ওয়াশিংটনের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দুই দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে বাড়তে থাকা টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতের এ অবস্থান সামনে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে চলার অভিযোগ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মোদি। পরে তিনি ওই আলাপকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে আগের বছরগুলোতে ট্রাম্পকে ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করা মোদির বক্তব্যের তুলনায় এবারের প্রতিক্রিয়ায় উষ্ণতা কম ছিল এবং তা ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েতিগ বাজপেয়ির মতে, জয়শঙ্করের বক্তব্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি ‘খোলামেলা মূল্যায়ন’ উঠে এসেছে। তার ভাষায়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে সম্পর্ক নিয়ে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ছিল, ভারত তাদের অন্যতম। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান অবস্থার বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
বাণিজ্য নিয়ে টানাপোড়েন
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা বাণিজ্য। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৯১০ কোটি ডলার। এতে ভারতের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৫ হাজার ৮৪০ কোটি ডলার।
নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দেশ নিজেদের স্বার্থকে এতটাই প্রাধান্য দিতে পারে না যে অন্য দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় তিনি ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে মোটামুটি একটি সমঝোতা হলেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। জয়শঙ্কর বলেন, জয়শঙ্কর বলেন, ‘ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকে একটু দূর থেকে তাকালে দেখি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশের আরও কঠিন সম্পর্ক রয়েছে। এটি হয়তো সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কথা নয়। তবে এটাই বাস্তবতা।’
এরপর জয়শঙ্কর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব আলোচনায় এ পর্যন্ত একটি চুক্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তি এখনো হয়নি।
জয়শঙ্কর শুরুতেই বলেন, ‘দেশগুলোর নিজেদের নিয়ে এতটা আত্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়, যাতে তারা নিজেদের জগতের মধ্যেই থাকবে, নিজেরাই সব সিদ্ধান্ত নেবে। এরপর বলবে, আপনাদের জীবন কঠিন করে তোলা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না।’
দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে কৃষি খাত। কৃষকদের সুরক্ষায় ভারত কয়েক দশক ধরে নিজেদের বাজার অনেকটাই বন্ধ রেখেছে।
বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে মোটামুটি একটি বোঝাপড়া হয়েছে জানিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, দ্রুত অগ্রগতির যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। আর বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল।
একসময় ট্রাম্পের আরোপ করা সবচেয়ে বেশি শুল্কের মুখে পড়া দেশগুলোর একটি ছিল ভারত। বিভিন্ন দেশের ওপর ব্যাপক হারে আরোপ করা ট্রাম্পের শুল্ক গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেন। এরপর তাঁর প্রশাসন দ্রুত অন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে ছিল বিশ্বজুড়ে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প এমন একটি আইনে সই করেছেন, যার আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
কানাডা ও পাকিস্তানে ভারতের হাইকমিশনার এবং পোল্যান্ডে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক অজয় বিসারিয়া আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো আরও প্রকাশ্যে বলবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা বেশ বেড়েছে। একই সঙ্গে এমন একটি ধারণাও তৈরি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চাপ দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও ভারত এত দিন নীরব ছিল।
ভারতের ওপর নতুন করে আরোপ করা ১০০ শতাংশ শুল্ক এক মাসের কম সময়ের মধ্যে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। বিসারিয়া বলেন, এটি ‘এই মুহূর্তে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার মতো বিষয়’।
অবসরপ্রাপ্ত এই কূটনীতিক আরও বলেন, যদি এটি বাস্তবে কার্যকর হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের সব প্রচেষ্টাই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
বাণিজ্যের পাশাপাশি ‘সন্ত্রাসবাদ’ও ভারতের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। গত বছরের মে মাসে ভারতশাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘাত হয়।
এরপর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে নিজের ভূমিকার কথা বারবার তুলে ধরেছেন। নয়াদিল্লি এ ধরনের মধ্যস্থতার দাবি পছন্দ করেনি। ভারতের অবস্থান হলো, কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়গুলো দুই দেশের মধ্যেই দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান হওয়া উচিত।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দিয়েছেন। ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের এই ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশী একটি দেশের নীতির কারণে ভারত সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়ে আসছে। ভারতের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশটির উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্টভাবে বোঝে বা সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নয়াদিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্ত বলেন, ‘ভারতের সংবেদনশীল বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তান নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে এ অনুভূতি তৈরি হয়েছে—আমাদের বিষয়টি এখন প্রকাশ্যে তুলে ধরা দরকার।’
এই বিশ্লেষকের ভাষ্য, ‘শীর্ষ পর্যায়ে যখন আপনি পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি দেখতে পান না, তখন হিসাব-নিকাশ বদলে যায়। তখন মতপার্থক্যগুলো প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
দেশের ভেতরের চাপও কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান বদলের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি এবং এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিতে পরিবর্তন ভারতীয়দের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিশেষায়িত কর্মক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের এই কর্মসূচির অন্যতম বড় সুবিধাভোগী দেশ ভারত। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে আবেদনকারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বাধা ও ফি বাড়ানো হয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, একসময় মানুষের এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলাচলকে অর্থনৈতিক সুবিধার অংশ হিসেবে দেখা হলেও এখন মানুষের চলাচলের অর্থনীতি ও রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। জনমতের দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হর্ষ পান্তের মতে, অভিবাসনের মতো বিষয় সরাসরি ভারতের সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের কাছে আকর্ষণীয় অংশীদার হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ভূমিকা রেখেছে, সেগুলোই এখন দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, ভারতের জনমতেও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে এবং সরকার এখন প্রকাশ্যে সেই নেতিবাচক মনোভাবের বিষয়টি তুলে ধরছে।
মোদি সরকারের ওপরও চাপ বাড়ছে বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক অজয় বিসারিয়া। তাঁর মতে, দেশে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে। সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন থাকায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বিষয়টিকে প্রভাবিত করতে পারে।
ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষা?
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার সময় ভারতের কৌশলগত মহলের অনেকে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। এর অন্যতম কারণ ছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মোদির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসে সম্পর্কের সেই উষ্ণতা অনেকটাই কমেছে।
তবে চ্যাথাম হাউসের গবেষক চিয়েতিগ বাজপেয়ির মতে, মতপার্থক্য বাড়লেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কেউই সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। তার মতে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি হলে সম্পর্ক উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে হর্ষ পান্তের মতে, এখন নয়াদিল্লির সামনে বড় প্রশ্ন হলো ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে কি না। তার ভাষ্য, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি ও নিয়মের প্রতি তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে সামলানো হবে, সেটিই এখন ভারতের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক প্রশ্ন।